বাউল চিকিৎসা পদ্ধতি

মৃদুল সান্যাল

বাউল সাধনা আমাদেরকে এমন একটি বিচিত্র পরিবেশের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় যা একদিকে যেমন সাধারণ তেমনি অসাধারণও বটে।একদিকে এই সাধনা ইন্দ্রিয় আচার ভিত্তিক যৌননির্ভর অন্যদিকে মরমী বা আধ্যাতিক।বাউলরা শুধু ভক্তিবাদী নন তারা জ্ঞানেও বিশ্বাসী। বাউলের চিকিৎসা  পদ্ধতিও একটু ভিন্ন। এরা প্রয়োজনে অন্যদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন কিন্তু নিজেরা অন্যদের কাছ থেকে কোনরূপ চিকিৎসা গ্রহণ করেন না।

পাশ্চাত্যের একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ‘মাইকেল গার্ভার’ বাউলদের চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে বলেন “বাউলরা যোগসাধনা করেন। এই যোগসাধনার মাধ্যমে তারা দেহের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নাড়ীকে সচল করে থাকেন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শরীরকে নিরোগ করে তোলেন।আমি এই যোগসাধনাকে কোন রহস্যজনক বা গুপ্ত বিষয় মনে করি না।”

গার্ভার আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের Lymph system এর বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে যোগীদের অভিজ্ঞতাকে অভিনব এবং অসাধারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন “Amazingly, a chart of the ancient Hindu pressure points is nearly identical to chart of the lymph system as identified by modern lymphan giography.”

এবারে আসা যাক বাউলদের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতির প্রথমেই বলা যায় ‘শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে দেহের কার্য সাধন’। মানবদেহে বায়ুর গুরুত্ব অপরিসীম। তান্ত্রিক, যোগী ও বাউলদের মতে বায়ুর যথাযথ প্রয়োগ শারীরিক সুস্থতা আনতে সক্ষম। মহিমশাহ, মনোরঞ্জন,মহেন্দ্র গোঁসাই এবং নিজামুদ্দিন বাউলমতের অনুসারী ও বিশেষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তাদের মতে, একজন সাধক যোগমতে বায়ুকে বাম নাক দিয়ে গ্রহণ ও ডান নাক দিয়ে নিঃসরণ করবে। এভাবে বায়ু শোধন করলে শ্লেষ্মাজনিত পীড়া থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।আঙ্গুল দিয়ে কখনো ডান নাক ও কখনো বাম নাকের দ্বার বন্ধ করে শোধন কাজ করতে হয়।

এই মতে বাম নাসিকা চন্দ্র এবং ডান নাসিকা সূর্য। দীর্ঘদিন এই প্রক্রিয়া চর্চা করলে শরীরের সকল নাড়ী বিশুদ্ধ হয় বলে তারা বিশ্বাস করেন।

বাউল চিকিৎসা পদ্ধতি আলোচনার এ পর্যায়ে বলা যায় ‘জলের কার্যকরণ’ সম্পর্কে।বাউল মতে শরীরে জলের ব্যবহারে নানা ব্যাধির বিনাশ ঘটে। সাধক নাকের মাধ্যমে জল গ্রহণ করে তা মুখ দিয়ে বের করে দেবে। বার বার এই প্রক্রিয়ায় দেহ শ্লেষ্মামুক্ত হবে। আবার মুখ দিয়ে জল গ্রহণ করে নাক দিয়ে নিঃসরণ করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় দেহে লাবন্য আসে, শরীরের স্থবিরতা দূর হয় এবং বার্ধক্য সহজে আসে না।

বাউলদের চিকিৎসার এ পর্যায়ে বলবো ‘রস পান’এর কথা। বাউল সাধনায় নানা রস পানের কথা আছে। এই রস বলতে মূত্র, রজঃ, বীর্য এবং স্তন্যদুগ্ধ। বাউলদের মধ্যে এই রসপান প্রচলিত। শারীরিক অসুখে তারা এসব রস পান করে থাকেন।যেমন পেটের ব্যথায় প্রস্রাব পান, মাথা ব্যথায় প্রস্রাব দিয়ে মাটি সিক্ত করে তা কপালে মাখা ইত্যাদির ব্যবহার রয়েছে। রতিনিরোধে স্বীয় বীর্যপান তাদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। তারা বিশ্বাস করে এতে দেহের নানা রোগ দূরীভূত হয় এবং দেহ লাবণ্যময় হয়। এছাড়াও বীর্যপানে বীর্যস্খলন সহজে হয় না। বাউলদের মধ্যে স্তন্যদুগ্ধ পান করার রেওয়াজ আছে। ছেউরিয়া লালনের আখড়াবাড়িতে একজন যক্ষারোগী নিয়মিত স্তন্যদুগ্ধ পান করে অনেকদিন বেঁচে ছিল। বাউলদের মধ্যে সর্বরোগ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ‘চারিচঁন্দ্র’ অর্থাৎ মল, মূত্র, রজঃ ও বীর্য মিশ্রণে এক প্রকার পদার্থ তৈরী করে তা ভক্ষণের রীতি বাউলসমাজে আছে। একে ‘প্রেমভাজা’ও বলা হয়।

এই চারিচঁন্দ্র সমগ্র শরীরে মর্দন করা হয়ে থাকে। তাদের মধ্যে এমন ধারণা আছে যে শুক্রাণু স্খলনের মুহূর্তে উর্দ্ধে ওঠাতে সক্ষম হলে অনন্ত যৌবন লাভ সম্ভব হয়। চারিচঁন্দ্র গায়ে মাখলে চর্মরোগ হয় না এমন ধারণা বাউলদের মধ্যে আছে। বাউলগানেও আমরা চারিচন্দ্রের ব্যবহার দেখা যায় “চেয়ে দেখ নারে মন দিব্য নজরে, চারিচাঁদ দিচ্ছে ঝলক মণিকোঠার ঘরে।”

বাউল সাধনা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে ‘গাঁজা খাওয়া’র প্রচলন রয়েছে। এই গাঁজা খাওয়ার মূলে বাউলদের মধ্যে একটি বিশ্বাস রয়েছে যে এতে শরীরে এক প্রকার রাসায়নিক বিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় যার ফলে বীর্যস্খলন সহজে হয় না এবং সাধক সাধিকাগণ দীর্ঘক্ষণ রতিক্রিয়া বা কায়া সাধনায় নিবিষ্ট থাকতে পারেন।

বাউলরা নিরামিষাশী।  তাদের সমাজে কোন প্রকার মাংস ভক্ষণের প্রচলন নেই। তারা বিশ্বাস করে মাংস ভক্ষণে পাকস্থলী গরম হয়ে শারীরিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। শরীরে স্বাভাবিকভাবে কিছু প্রোটিনযুক্ত খাদ্য  প্রয়োজন পুষ্টিসাধনের জন্য। একারণে তারা মাছ, দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার যেমন দই, পায়েস ইত্যাদি খেয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে বাউলেরা রোগ নিরাময়ে কিংবা পুষ্টিসাধনে উপরোক্ত দ্রব্যাদি ব্যতিরেকে কোন গাছগাছড়া,ফুল,ফল ইত্যাদি গ্রহণ করেনা।

বাউলদের উপরোক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণ নয়। আরো কিছু বিষয় আছে যেগুলো উপস্থাপন করা উচিৎ নয়।

শেষকথায় বলতে পারি ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানী ‘পি.সি. রায় দেবীপ্রসাদ বাউল চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন “As a matter of fact, it is in this field of alchemy that the contribution of tantrikas to Indian science was most notable.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *