দূরবীন

অলিভা দে দেব

 

বাড়ির   সবকটা ঘরের মধ্যে দক্ষিণী ঘরটাই অলির পছন্দের। কিন্তু তার চেয়েও বেশী পছন্দের হল টব দিয়ে নানাফুলে সাজানো খোলা ছাদটাই। 

একটু রাতের দিকে মাঝে মাঝেই অলি, তারাময় আকাশের নীচে খোলাছাদে গিয়ে দূরের তারাদের দিকে তাকিয়ে আকাশ-পাতাল অনেক কিছু ভাবতে থাকে। আর যদি কোনো দিন বিকেলেরদিকে বৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলেতাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে থাকা চাঁপা ফুলের গাছটা থেকে বৃষ্টিভেজা চাঁপাফুলের গন্ধে অলি হারিয়ে যায় এক অন্য জগতে। 

ছোট বেলায় যখন রাতে লোডশেডিং হয়ে যেত, এখনকার মত তখন তো আর বাড়ি-বাড়ি ইন্‌ভাটর ছিল না, তাই লোডশেডিং হওয়া মানেই সারা বাড়ি আর পাড়া অন্ধকারে ডুবে যেত। আর সেই অন্ধকারে ছাদে মাদুরপেতে বালিশ নিয়ে শুয়ে ছোট বোনকে নিয়ে বাবার সঙ্গে কত রাত যেআকাশের তারাদের নিয়ে কত গল্প শুনেছে, এখন সেই সব দিন গুলিকে খুব মনে পরে অলির। 

আজও একটু রাতের দিকে অলি মেয়েকে ঘুমপারিয়ে চলে গিয়েছিল ছাদে।  একটু বুকভরে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে  নিঃশ্বাস  নেবে বলে। 

কিন্তু সত্যিই কী মেয়েদের জীবনে খোলা আকাশ বলে কিছু হয়!

আজ সারাদিন মেয়ের স্কুলের অ্যাডমিশনের জন্য অনেক কিছু প্রমাণ করতে হয়েছে তাকে। তার সন্তানের “সিঙ্গেল মাদার” হিসাবে। তাই আজ নিজের সাথে  নিজেকে আর এই সমাজ ব‍্যাবস্হার সাথে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে তাকে। 

মেয়ের অ্যাডমিশনের ফর্মে অভিবাবকের স্বাক্ষর  বলে কিছু ছিল না। ছিল শুধু “পিতার স্বাক্ষর। ” আর সেটা নিয়েই আজ অলির নিজেকে প্রমাণ  করার পালা ছিল। 

শুধু বাবা কেন? একজন মা-ও হতে পারে একটি সন্তানের অ্যাডমিশনের জন্য বিবেচ্য। 

অলি বুঝতে পারে না, দশমাস-দশদিন নিজের শরীরের মধ্যে, নিজের রক্ত-মাংসে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা সন্তানকে সে যখন ভোর সারে চারটে থেকে রাত সারে নটা পর্যন্ত প্রসব যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে জন্মদিয়েছিল, আজ সেই মা কেই তার বাচ্ছার ভর্তির জন্য তাকে শুধু একা থাকলে হবে না! বাবাকে পরে হলেও দেখিয়ে যেতে হবে, এই শর্তে অলির মেয়েকে ভর্তি করা হবে। 

শুধু সন্তান  প্রসবেই মা-কে দরকার।  জন্মের পর পিতৃ পরিচয়েই সে সমাজে পরিচিত হবে। মাতৃ পরিচয়ে নয়! কিন্তু কেনো? আমরা এখনও কোন সমাজে পরে আছি? একটা মেয়েদের স্কুলেই, একটা মেয়ের জন্য এই নিয়ম!

আজ যদি রাতের অন্ধকারে দু-তিনটে ছেলেমিলে অলিকে ধর্ষণ  করে যেত, আর তার ফসল স্বরূপ  যদি তার কোনো সন্তান হত তাহলে অলি কোন পিতৃ পরিচয়  দিত তার সন্তানের। না কি একজন ধর্ষিতার মেয়ে বলে সে স্কুলেই পড়তে পারত না!

একজন বাবার পরিচয়ে বড়ো হয়ে ওঠা বাচ্ছাকে যদি সমাজ গর্বের সঙ্গে মেনে নেয় তবে, একজন মায়ের পরিচয়ে বেড়ে ওঠা সন্তানকে কেনো সমাজ আঙ্গুল তুলে দেখাবে? কেনো সারা সমাজকে উত্তর  দিতে হবে “তোমার এই ফসলটা কোন বীজের?”

কেনো? অলি মেয়ে বলেই কি তাকে উত্তর দিতে হবে!

বাবা-মা যদি একসাথে না থাকে, একটা বাচ্ছা সে, ছোটবেলা থেকে তার মা-এর কাছে না বাবার কাছে বড়ো হচ্ছে তার উপরে নির্ভর করেই বাচ্ছাটার পরিচয় হওয়া ভালো বলে অলি মনে করে। 

অলি এই সবের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারে, আমাদের এই সমাজ ধর্ষণ , ধর্ষিতা, আর “সিঙ্গেল মাদার” নিয়ে যতই বড় বড় কথা বলুকনা কেনো। এখনও আমাদের এই সমাজ অনেক পিছিয়ে সেই মানুষিকতার দিক থেকে। 

 

একদিন হয়তো এই সমাজ মাতৃ পরিচয়ে বেড়ে ওঠা একটা বাচ্ছাকে আর আঙ্গুল তুলে দেখাবে না।  কিন্তু সেই দিনটা দেখার জন্য আমাদের আরও অনেক দিন বোধহয় অপেক্ষা করতে হবে। 

তার লড়াইটা হয়ত, অলির মত অনেক মেয়ের হাত ধরেই শুরুটা হয়ত হয়েছে । কিন্তু তার পুরোপুরিভাবে সাফল্য আসতে অলিদের এখনও অনেক কিছু করতে হবে।  দেখতে হবে, সহ্য করতে হবে অনেক কিছু। 

 

শ্বশুরবাড়ির সম্মান বউমা কে রাখতে হয়।  কিন্তু বাড়ির বউ এর সম্মান? সেটা নিয়ে শ্বশুরবাড়ির কারও কোনো মাথা ব্যাথা থাকতে নেই। কেনো? এই প্রতিবাদেই তো একদিন অলির শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে-আসা। 

আজ তার সাথে যুক্ত হলো আর একটা প্রতিবাদ। সামাজিক প্রতিবাদ । যেটা হয়ত অলির জীবনে অনেক দিন আগেই শুরু হয়ে ছিল নিজের ঘর থেকে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *