আরেকবার ক্ষুধিত পাষাণ

(রবীন্দ্রনাথের প্যাশটিশ)

মলয় রায়চৌধুরী

আমি এবং আমার আত্মীয় বিদেশ ভ্রমণ সারিয়া দিল্লি বিমানবন্দর হইতে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতেছিলাম, এমন সময়ে দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে সহযাত্রীটির সহিত পরিচয় হয় ; তিনি লণ্ডনে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বক্তৃতা দিয়া স্বদেশে ফিরিতেছিলেন । তাঁহার বেশভূষা শ্মশ্রুকেশ দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল । তাঁহার কথাবার্তা শুনিয়া আরো ধাঁধা লাগিয়া যায় । আলোকচিত্র বিষয়ে তো অবশ্যই, এতদ্ব্যতীত পৃথিবীর সকল বিষয়েই এমন করিয়া আলাপ করিতে লাগিলেন, যেন তাঁহার সহিত প্রথমে পরামর্শ করিয়া বিশ্ববিধাতা সকল কাজ করিয়া থাকেন । বিশ্বসংসারের ভিতরে ভিতরে যে এমন সকল অশ্রুতপূর্ব নিগূঢ় ঘটনা ঘটিতেছিল, রুশিয়ানরা যে এতোদূর অগ্রসর হইবার পরও আত্মধ্বংসের পথে চলিয়া গিয়াছে, চিনারা চেয়ারম্যান মাওয়ের বিশাল তৈলচিত্র টাঙাইয়া সাম্যবাদের পুঁজিবাদী পরীক্ষায় সফল হইয়াছে, পেটরল লইয়া আমেরিকানদের যে এমন সকল গোপন মতলব আছে, দেশীয় রাজনৈতিক নেতাদের অধঃপতন এবং বপুর স্ফীতি সীমা অতিক্রম করিয়াছে, গণতন্ত্র যে এমন খিচুড়ি পাকিয়া উঠিয়াছে, টাকার এভারেস্টে না উঠিলে নির্বাচনের শৃঙ্গ জয় অসম্ভব, এ সমস্ত কিছুই না জানিয়া আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হইয়া ছিলাম ।
বাবুটি প্রকৃত কৃষ্ণবর্ণ, তাই বলিয়া তাঁহার গায়ে ভ্রমর বসিলে যে দেখা যাইবে না, অথবা কালি মাখিলে জল মাখিয়াছেন বোধ হইবে, কিংবা জল মাখিলে কালি মাখিয়াছেন বোধ হইবে, এমন নহে । যেরূপ কৃষ্ণবর্ণ আপনার ঘরে থাকিলে শ্যামবর্ণ বলি, পরের ঘরে হইলে পাতুরে কালো বলি, বাবুটির ত্বক সেইরূপ কৃষ্ণবর্ণ । তাঁহার চক্ষুদুটি এরূপ যেন সদাসর্বদা অগ্নিস্ফূলিঙ্গ নির্গত হইতেছে । দারপরিগ্রহে জ্ঞানোপার্জনের বিঘ্ন ঘটে আশঙ্কায় নিতান্ত নিরুৎসাহে অদ্যাবধি বাবুটি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন নাই, বসতবাটী হইতে দূরে রাজস্হানি মারোয়াড়ি অধ্যুষিত আকাশচুম্বী অট্টালিকায় একটি দুই কামরার আবাস ভাড়া লইয়া কম বয়সী যুবতীর সহিত একত্রে বসবাস করিতেছেন, সে তথ্য স্বয়ং স্বীকার যাইলেন ।
আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ আমাদের নবপরিচিত আলাপিটি ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন : There happen more things in haven and earth. Horatio, than are reported in your newspapers. আমরা বহুকাল ইউরোপ আমেরিকায় সময় অতিবাহিত করিয়া স্বগৃহে ফিরিতেছি, সুতরাং আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ লোকটির রকমসকম দেখিয়া অবাক হইয়া গেলাম । লোকটা সামান্য উপলক্ষে কখনো বিজ্ঞান বলে, কখনো বেদের ব্যাখ্যা করে, কখনো ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায় স্লোগানের বোমাবাজদিগের বহুরূপীস্বভাবের গল্প বলে, পাকিস্তানের দাবি করিয়া যে উচ্চবর্ণ বাঙালিরা নিম্নবর্গদিগকে ফেলিয়া পূর্ববঙ্গ হইতে ভারতে পলাইয়া আসিয়াছিল এবং সিংহাসনে বসিয়া পরমানন্দে আখের গোছাইয়া লইয়াছে তাহাদের গোপন কাহিনি শোনায় , আবার কখনো কোয়ান্টাম ফিজিক্স ও উত্তরাধুনিকতা আওড়াইতে থাকে । বিজ্ঞান, বেদ, মার্কসবাদী পুঁজিবাদ, জাতিপ্রথা-নির্ভর গান্ধিবাদ এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্সে আমাদের কোনোরূপ অধিকার না থাকাতে, তাঁহার প্রতি আমাদের ভক্তি উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল।
আমার সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির মনে দৃঢ় বিশ্বাস হইল যে, আমাদের এই আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ সহযাত্রীর সহিত কোনো-এক রকমের অলৌকিক ব্যাপারের কিছু একটা যোগ আছে — কোনো-একটা অপূর্ব চৌম্বকত্ব অথবা দৈবশক্তি, অথবা সূক্ষ্ম শরীর, অথবা ঐ ভাবের একটা-কিছু । তিনি এই অসামান্য মানুষটির সমস্ত সামান্য কথাও ভক্তিবিহ্বল মুগ্ধভাবে শুনিতেছিলেন এবং গোপনে নোট করিয়া লইতেছিলেন । আমার ভাবে বোধ হইল, অসামান্য ব্যক্তিটিও গোপনে তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং কিছু খুশি হইয়াছিলেন ।
আমার সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির কার্যকলাপ স্বচক্ষে দেখিয়া ভূমিসংস্কারক নেতা বিনয় চৌধুরী একদা বলিয়াছিলেন যে বঙ্গদেশের গণতন্ত্র বাই দি ঠিকেদার ফর দি ঠিকেদার অফ দি ঠিকেদার হইয়া গিয়াছে । আত্মীয়টি সিন্ডিকেট নামক একটি যুবক-সমবায় স্হাপন করিয়া প্রচুর কাঁচা টাকা একত্র করিয়াছিলেন এবং বিদেশভ্রমণের সাধ মিটাইবার ও বিখ্যাত মণীষীদের সাক্ষাৎ পাইবার জন্য রক্তপিপাসু জোঁকের ন্যায় আমার সঙ্গ লইয়াছিলেন । বিদেশে আমরা আলবার্ট আইনস্টাইন, রমাঁ রোলাঁ, এইচ জি ওয়েলস, ডাবলিউ বি ইয়েটস, এজরা পাউণ্ড, রবার্ট ব্রুজেস, আরনেস্ট রাইস, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, আগা খাঁ, রেজা শাহ পহলভি, হেনরি বার্গসঁ, রবার্ট ফ্রস্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, বেনিতো মুসোলিনি প্রমুখের সহিত দেশ ও দশের কল্যাণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সারিয়ে ফিরিতেছিলাম ।
সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির প্রপিতামহ অভিবক্ত বঙ্গের স্বনামধন্য মানুষ ছিলেন, সেই সময়ের বঙ্গে, বর্তমানে যাহা ভারতীয় বঙ্গ ও বাংলাদেশ নামে দুইটি পৃথক দেশ, উভয় অংশেই তাঁহার প্রভূত জমিদারি জমিজমা ছিল এবং আফিম ও নীল চাষ হইত । চিনদেশে আফিম রপ্তানি করিয়া এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গগণকে নিয়মিত রৌপ্যমুদ্রা উপঢৌকন দিয়া কলিকাতায় একখানি বৃহৎ পারিবারিক অট্টালিকা নির্মাণ করিয়াছিলেন । কথিত আছে যে বিলাতে তাঁহার আকস্মিক মৃত্যু হয় এবং তথায় তাঁহাকে সমাধিস্হ করা হইয়াছিল, যদ্যপি তাঁহার বঙ্গদেশীয় হৃৎপিণ্ডখানি কর্তিত করিয়া স্বদেশে আনিয়া ধর্মমতে কলিকাতায় অন্ত্যষ্টি করা হইয়াছিল । কিন্তু আত্মীয়টির পিতামহ খ্রিস্টধর্মাবলম্বীগণের ধর্মাচরণ ও ধর্মগ্রন্হে আকৃষ্ট হইয়া তদৃশ একটি ধর্মস্হাপনের প্রয়াসে আত্মনিযুক্ত হইবার ফলে প্রপিতামহের ব্যবসায় এবং জমিদারির চাষবাস এতোই অবহেলিত হয় যে ক্রমে তাঁহাদের সন্তান-সন্ততি ধর্ম ও বিদ্যাশিক্ষায় আগ্রহান্বিত হইয়া প্রপিতামহের ব্যবসায়কে অতল জলরাশিতে নিমজ্জিত করিয়া দেন । পরবর্তী প্রজন্মের বংশধরগণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই যে ঐশ্বর্যের নিজের কোনো লজ্জাবোধ নাই । যাহাই হউক, সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টি তাহা বুঝিতে পারিয়াছেন এবং উত্তরঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ধনবৈভবের পূজারীরূপে প্রতিষ্ঠা পাইয়াছেন ।
আমি যখনই বিদেশযাত্রা করি, অথবা স্বদেশেও কোথাও ভ্রমণে যাইলে সঙ্গী লইয়া যাইতে পছন্দ করি, এই জন্য যে তাঁহারা পরবর্তীকালে আমাকে লইয়া স্মৃতিকথা লিখিয়া কিঞ্চিদধিক রোজগারপাতি করিবেন, এবং তাঁহাদের স্মৃতিকথার উপর নির্ভর করিয়া অধ্যাপকবৃন্দ আমাকে লইয়া ইচ্ছামতো গল্প ফাঁদিতে পারিবেন ও ছাত্রছাত্রীদিগকে পিএইচ ডি পাইতে পথনির্দেশ করিতে পারিবেন । একই কারণে আমি গুণগ্রাহী তরুণ-তরুণী এবং আত্মীয়-অনাত্মীয় পরিচিত-অল্পপরিচিত ব্যক্তিগণকে নিয়মিত চিঠি লিখিয়া থাকি, যাহাতে তাঁহারা আমার মৃত্যুর পর চিঠিগুলি ভাঙাইয়া খাইতে পারেন, আমার আলোকে কিঞ্চিদধিক অন্ধকারের বাহিরে আসিবার সুযোগ লইতে পারেন, আমার জীবনের দুঃখজনক ঘটনাবলী ফেনাইয়া কেচ্ছা লিখিয়া কোটিপতি হইতে পারেন ।
লণ্ডনের হিথরো বিমানবন্দর হইতে আসিয়া আমাদের বিমানটি দিল্লিতে নামাইয়া দিল, আমরা দমদমগামী বিমানের অপেক্ষায় লাউঞ্জে সমবেত হইলাম। তখন রাত্রি সাড়ে দশটা । কলকাতায় সার্বিক ধর্মঘট অথবা ব্রিগেড সমাবেশ জাতীয় একটা-কী ব্যাঘাত হওয়াতে বিমান অনেক বিলম্বে আসিবে শুনিলাম । আমি সন্ধ্যার পান-ভোজন সারিয়া ইতিমধ্যে মখমলশোভিত সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমাইব স্হির করিয়াছি, এমন সময়ে আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ অসামান্য ব্যক্তিটি নিম্নলিখিত গল্প ফাঁদিয়া বসিলেন । যৎসামান্য সিঙ্গল মল্ট পান সত্ত্বেও সে রাত্রে আমার আর ঘুম হইল না :—

ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিক পত্রিকার পক্ষ হইতে বিদেশে কয়েকটি অভিশপ্ত প্রাসাদ ও গৃহাদির গোপন কাহিনি ও আলোকচিত্রের কর্মটি সুসম্পন্ন করিবার পর পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ভারতের শরিফাবাদে অবস্হিত অভিশপ্ত অট্টালিকাটির আলোকচিত্র তুলিয়া একটি নিবন্ধ লিখিবার প্রস্তাব দিলে আমি তৎক্ষণাত রাজি হইয়া গিয়াছিলাম । আলোকচিত্র হইল আমার মাদকীয় আধ্যাত্মিকতা ।
তখন দেশ অরাজক । ইংরাজ শাসক স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন । ইংরাজ শাসকের পর যাহারা গদিনশীন হইল তাহারা দেশকে ছারখার করিয়া দিবার খেলায় মত্ত হইয়া গেল । যাহারা গদিনশীন হইবার প্রয়াস করিতেছিল, তাহাদের অত্যাচারে বরেন্দ্রভূমি ডুবিয়া যাইতেছিল । অনেকেই কেবল খাইতে পায় না তা নয়, গৃহে পর্যন্ত বাস করিতে পারে না । যাহাদের খাইবার নাই তাহারা পরের কাড়িয়া খায় । কাজেই গ্রামে গ্রামে দলে দলে চোর-ডাকাত । কাহার সাধ্য শাসন করে । পারস্পরিক হত্যা, গ্রাম হইতে বিতাড়ন, জলচল বন্ধ, পাকা ফসল ও খামারে অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদির মাধ্যমে শাসক ও বিরোধী সম্প্রদায় জনগণকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস করিতেছিল ।
অভিশপ্ত প্রবন্ধশৃঙ্খলা লিখিবার নিমিত্ত প্রথমে গিয়াছিলাম ক্যাম্বোডিয়াস্হিত তুয়োল স্লাঙ গণহত্যা প্রদর্শশালায় । এই গৃহটি তৎকালীন একাধিপতি পল পটের গুপ্তচরগণ, যে নাগরিকদিগকে সন্দেহ করিত তাহাদের তুলিয়া আনিয়া যৎপরোনাস্তি যন্ত্রণা দিয়া হত্যা করিত । চিকিৎসক অধ্যাপক শিক্ষক প্রযুক্তিবিদ বিজ্ঞানী প্রমুখ ব্যক্তিগণকে চাষবাসে নিযুক্ত করিয়াছিলেন পল পট, এবং তাঁহার বশংবদগণ সন্মানীয় ব্যক্তিগণকে খেতে-খামারে অকর্মণ্যতার জন্য চাবুক দ্বারা পিটাইত, বন্দুকের গুঁতা দিয়ে অষ্টপ্রহর খাটাইত, যে কারণে তাঁহারা প্রায় সবাই মৃত্যু বরণ করেন । প্রদর্শশালায় বর্তমানে সতেরো হাজারেরও বেশি নিহত মানুষের চিৎকার শুনিতে পাওয়া যায় ; পল পট যে কতো লক্ষ মানুষকে যাতনা দিয়া হত্যা করিয়াছিল তাহার হিসাব মেলে নাই, কিন্তু সেই নিহত মানুষগুলির ছায়াশরীর এখনও যাতনাদানকারীদিগের বংশধরদের পিছু ধাওয়া করে । আমি আমার শব্দধারকযন্ত্রে চিৎকারের কিয়দংশ ধরিয়া রাখিয়াছি, লিখিবার সময়ে ক্রন্দনাশ্রুর অনুনয়-বিনয় শুনিলে বাক্যাদি স্বাবলীলতায় কলমের সূচ্যাগ্রে চলিয়া আসে । বিস্ময়ের ব্যাপার হইল যে বামপন্হীগণ তিরিশ বৎসরেরও বেশি পশ্চিমবঙ্গে পলপটিয় সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস করিলেও অদ্যাপি কেহই পল পট সম্পর্কে কোনো কথা বলা সমিচীন মনে করেন নাই, তাহাঁদের মৌনতা একটি হুডিনি রহস্য ।
স্কটল্যাণ্ডের এডিনবরায় মেরি কিংস ক্লোজ নামে একটি অভিশপ্ত অঞ্চলের আলোকচিত্র লইবার নির্দেশ পাইয়া কয়েক দিন কাটাইবার পর এক পক্ককেশ বৃদ্ধা ও একটি কম বয়সি মেয়ের ছায়াশরীরের অস্তিত্ব জানিতে পারি ; ভ্রমণকারীগণও অনেকে তাহাদের উপস্হিতি, পদধ্বনি ও হাসাহাসি শুনিতে পায় । আপনারা ইউনাইটেড কিংডম ভ্রমণে যাইলে অবশ্যই মেরি কিংস ক্লোজ দেখিয়া আসিবেন । সন্ধ্যার পর পর্যটকগণের প্রবেশ নিষেধ । দুর্ভাগ্য যে আমার আলোকচিত্রগুলিতে সেই বৃদ্ধা ও তাহার নাতনির মৃত্যুপরবর্তী ছায়াশরীরের কোনও আভাস ভাসিয়া উঠে নাই । আমার যন্ত্রে তাঁহাদের কন্ঠস্বরও ধরিয়া রাখিতে পারি নাই ।
আমাদিগের দেশে রাজস্হান রাজ্যের আলওয়ারে ভাঙ্গার দুর্গে অবশ্যই যাইবেন । কথিত আছে যে জনৈক স্বাস্হ্যবান তন্ত্রসাধনাকারী যুবক প্রাসাদনিবাসিনী এক সুন্দরী রাজকন্যার প্রেমে আক্রান্ত হইয়া জাদুটোনার মাধ্যমে যুবতীটিকে বশীভূত করিবার প্রয়াসে বিফল হইবার পর আত্মহত্যা করিয়া লয় এবং মৃত্যুশয্যায় অভিশাপ দিয়া যায় যে দুর্গস্হিত সকলেই কয়েক দিবসের ভিতর উন্মাদ হইয়া যাইবে । কেহ উন্মাদ হইয়াছিল কিনা তাহার কোনো প্রমাণ নাই, তথাপি সন্ধ্যার পর দুর্গটিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করিয়া দেয়া হইয়াছে । বহু ভ্রমণার্থী মস্তিষ্কবিকারে আক্রান্ত হইয়াছেন । সন্ধ্যার পর দুর্গটিতে উন্মাদ অপচ্ছায়াদের চিৎকার এবং তান্ত্রিকের অট্টহাস্য শোনা যায় । এক্ষেত্রে আমার আলোকচিত্রে যদিও প্রমাণ পাই নাই, কন্ঠস্বর ধরিয়া রাখার যন্ত্রে উন্মাদ মানুষের চিৎকার ও তান্ত্রিকের অট্টহাস্য ধরা পড়িয়াছিল । ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের সম্পাদক মহাশয় বলিয়াছিলেন যন্ত্রটি বহু পুরাতন বলিয়া অমন আওয়াজ হইতেছে, বিজ্ঞানীগণ শুনিলে বিশ্বাস যাইবেন না।
তাহার পর গিয়াছিলাম সিংগাপুরের পুরাতন চাঙ্গি চিকিৎসালয় ভবনে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানি সৈন্যগণ ভবনটিতে শত্রুসেনাগণকে অকথ্য যন্ত্রণা দিত এবং দেহগুলি এলাইয়া পড়িলে হত্যা করিত । বহু ভারতীয় সৈন্যকে তাহারা যাতনা দিয়া হত্যা করিয়াছে । পর্যটকগণ যন্ত্রণাকাতর মানুষের ক্রন্দন শুনিতে পান, মৃতদেহ ছুঁড়িয়া ফেলিবার শব্দ শুনিতে পান, ভারতীয় সৈন্যগণের হিন্দুস্তানি ভাষায় ক্রন্দন শুনিতে পাওয়া যায়, জাপানি সেনার বুটজুতার পদশব্দ শোনা যায় । আমিও শুনিয়াছি কিন্তু আলোকচিত্রগুলিতে সেই ক্রন্দন ও মৃতদেহ ফেলিয়া দিবার আভাস ধরিতে পারি নাই ।
মেক্সিকোয় জোচিমিলকো নামে একটি স্হানের জনহীন দ্বীপে গিয়াছিলাম । দ্বীপটি এতোই অভিশপ্ত যে জলযানগুলি ভ্রমণকারীদের লইয়া দ্বিপ্রহরেই ফিরিয়া চলিয়া আসে । তথায় একদিন যে সময়ে মেঘপূঞ্জ স্বর্ণমালাবৎ পশ্চিম গগনে বিরাজ করিতেছিল, তৎসময়ে একটি বালিকা তাহার ডলপুতুল সামলাইতে গিয়া জলমগ্ন হইয়া মারা যায় । বালিকাটির আত্মার শান্তির জন্য জনৈক ব্যক্তি প্রচুর ডলপুতুল লইয়া গিয়া দ্বীপটিতে রাখিয়া আসিত । একদিন সেই ব্যক্তিটি সেই একই স্হানে জলে ডুবিয়া মারা যায় যেস্হানে বালিকাটি জলমগ্ন হইয়া অপঘাতে মারা গিয়াছিল । দিবাদ্বিপ্রহরেও বালিকার খিলখিল হাসি শুনিতে পাওয়া যায়। দ্বীপের যত্রতত্র রক্ষিত ডলপুতুলগুলি পর্যটকদিগের পানে তাকাইয়া থাকে এবং বহু ভ্রমণার্থী সেই দৃষ্টি এবং খিলখিল হাসি হইতে সারা জীবনেও মুক্তি পায় নাই । সৌভাগ্যবশত আমাকে কোনও ডলপুতুল বশীকরণ করিতে পারে নাই ।
এক্ষণে একটি অভিশপ্ত অরণ্যের কথা বলিব । ঘন অরণ্যটি জাপানের আকিগাহারায় স্হিত । বহু জাপানি যুবক-যুবতী এমনকী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাগণও সেই জঙ্গলে গিয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন । অরণ্যে প্রবেশ করিবার পর তাঁহাদিগকে আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই । আজও অনেক হতাশ্বাস মানুষ চুপি-চুপি অরণ্যটিতে প্রবেশ করিয়া হারাইয়া যান, এবং আত্মীয়গণ অনুমান করেন যে তাঁহারা আত্মহত্যা করিয়া লইয়াছেন । অরন্যটির ভিতর দিবাবসানে বহু মানুষের হাহাকার ও বক্ষ-চাপড়ানি শুনিতে পাওয়া যায় । কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে যে ভ্রমণের জন্য অরন্যটিতে প্রবেশ করিলে পথে পথে সীতার অলঙ্কারের ন্যায় চিহ্ণাদি রাখিয়া যেন অগ্রসর হন । অত্যন্ত ঘন জঙ্গল, আমি স্হানীয় এক অরণ্যপ্রদর্শক লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিয়াছিলাম, সবুজের বিভিন্নপ্রকার পার্থক্যসমাবেশে আলোকচিত্রগুলি চমৎকার ফুটিয়া উঠিয়াছিল, এবং একাধিক বৃক্ষের শাখা হইতে যেন গলায় রজ্জু বাঁধিয়া মানুষ ঝুলিয়া আছে এমত ইশারা চাক্ষুষ করিয়াছিলাম ।
এইবার স্বদেশের একটি অট্টালিকার ঘটনা বলিব । ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিক নির্দেশ দিয়াছিল যে এবার যেন ভারতের শরিফাবাদের বহুল প্রচারিত অবহেলিত ও অতিঅভিশপ্ত খণ্ডহরটির আলোকচিত্রসহ ছায়াশরীরগণের চিৎকার ও ক্রন্দন ও তথ্যাদি সংগ্রহ করিয়া পাঠাই । অর্ধশতকাধিক পূর্বে যে উগ্রক্ষত্রিয় পরিবার খণ্ডহরটিতে বাস করিতেন, তাঁহাদের পরিবারের জনৈক জীবিত সদস্য একজন তত্ত্ববধায়ক নিযুক্ত করিয়াছেন যিনি তাঁহাদের ভগ্নপ্রায় নিবাসটিতে দিবাবসান পর্যন্ত থাকেন । শরিফাবাদ নিবাসী আমার শ্যালক, অর্থাৎ মৃত স্ত্রীর বৃদ্ধ ভ্রাতা, অভিশপ্ত অট্টালিকাটির বিষয়ে তথ্যাদি দিবার পর আমি সেই অট্টালিকাটিকে কেন্দ্র করিয়া আলোকচিত্রের কর্ম আরম্ভ এবং তথ্যাদি সংগ্রহ করা মনস্হ করি। শ্রীমতী ঝুমা চট্টোপাধ্যায় নামক এক প্রথিতযশা লেখিকা-আলোকচিত্রী অভিশপ্ত অট্টালিকাটির কাহিনি ও আলোকচিত্র সংগ্রহ করিয়া আমাকে এতদ্বিষয়ে সম্যক অবহিত করিয়াছিলেন, আমি তাঁহার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ ।
শরিফাবাদস্হ খণ্ডহরের অভিশপ্ত দ্বিতল অট্টালিকাটির কেয়ারটেকার অর্থাৎ তত্ববধায়ক মহাশয়ের সহিত আমার শ্যালকের বহুদিনের পরিচয় ছিল । সহৃদয় তত্ববধায়ক মহাশয় আমাকে সেই অট্টালিকারই একটি অব্যবহৃত পরিত্যক্ত ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়া খাট-বিছানা পাতিয়া, মশারির ব্যবস্হা করিয়া, টেবিল-চেয়ার আনিয়া দিয়া থাকিবার ব্যবস্হা করিয়া দিলেন । প্রথম দর্শনেই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল যে আমার পূর্বে ঘরটি কেহ বহুকাল ব্যবহার করে নাই, অর্ধশতাধিক কাল চুনকাম হয় নাই । একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকা যে অভিশপ্ত তাহা আলোকচিত্রে ধরিয়া রাখিবার জন্য তথায় দুই-তিন দিন রাত্রিবাস প্রয়োজন, মনে করিয়াছিলাম, যেমন নামিবিয়ার জীবজন্তুর আলোকচিত্র লইবার সময়ে জঙ্গলের ভিতরেই তাঁবু খাটাইয়া রাত্রিবাস প্রয়োজন ছিল।
যে সময়ে শরিফাবাদের দ্বিতল অট্টালিকাটি অভিশপ্ত হয় নাই, সেসময়ে বিজলি ব্যবস্হা ছিল, যত্রতত্র বিজলির তার ভাঙা টিউবলাইট ঝুলিতে দেখিয়া অনুমান করিলাম, এখন তত্ববধায়ক মহাশয় কেরোসিন লন্ঠন এবং মোমবাতি জ্বালাইয়া সন্ধ্যাপর্যন্ত এই গৃহে থাকেন । সন্ধ্যা হইলে নিজ বাসভবনে চলিয়া যান ।
প্রথম দিবসেই মাথার উপরে শব্দতরঙ্গে আকাশমণ্ডল ভাসাইয়া পাপিয়া ডাকিয়া গেল । অনুমান করিলাম শুভলগ্নেই অট্টালিকাটিতে প্রবেশ করিয়াছি ।
তৎকালে জায়গাটি বড়ো রমণীয় ছিল । নির্জন পাহাড়ের নিচে বড়ো-বড়ো বনের ভিতর দিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমে দ্বারকেশ্বর ও দামোদর নদী দুটি, পূর্বপ্রান্ত ভাগিরতী ও উত্তরে অজয় নদী উপলমুখরিত পথে নিপুণা নর্তকীর মতো পদে পদে বাঁকিয়া বাঁকিয়া দ্রুত নৃত্যে চলিয়া গিয়াছে । ঠিক সেই নদীর ধারেই পাথরবাঁধানো বহুসোপানময় অত্যুচ্চ ঘাটের উপর একটি প্রাচীন স্হাপত্যের অট্টালিকা শৈলপদমূলে একাকী দাঁড়াইয়া আছে — নিকটে কোথাও লোকালয় নাই । খণ্ডহরের তত্ত্ববধায়ক মহাশয় বলিয়াছিলেন দ্বিতল অট্টালিকাটিতে একদা একটি উগ্রক্ষত্রিয় জমিদার পরিবার থাকিত, তাঁহাদের প্রচুর জমিজমা খেত-খামার ছিল । বাড়িটি অভিশপ্ত হইবার পূর্বে জমিদারের খেতগুলি ও ফসলের আড়ত এই স্হান হইতে কিয়ৎক্রোশ দূরে ছিল । সে সময়ে এই অঞ্চলে জোতদারেগণ সংখ্যায় শতাধিক, তখনও জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয় নাই ।
তত্তববধায়ক মহাশয়ের কাছে শুনিয়াছিলাম, তৎকালে যাহারা শরিফাবাদের প্রাচীন নিবাসী ছিলেন না, অন্যত্র হইতে আসিয়া তথায় ঘর বাঁধিবার প্রয়াস করিতেছেন, বিশেষ করিয়া দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান হইতে আশ্রয়প্রার্থীর দল, তাঁহারা কলহাস্যমুখর পরিবারের সেই দ্বিতল অট্টালিকা, যাহার মধ্যস্হলে একটি সুন্দর উদ্যান ছিল, তাহা দেখিয়া হিংসায় ও বিদ্বেষে জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিতেন এবং মনে-মনে ষড় করিতেন যে কখনও সুযোগ পাইলে প্রাসাদটিকে আক্রমণ করিয়া বিদ্ধস্ত করিয়া দিবেন, ভূস্বামীর বৈভব প্রদর্শনের গর্বের জন্য নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে উগ্রক্ষত্রিয় গৃহনিবাসীদের উচিত শিক্ষা দিবেন । এই সংবাদ আমি পরবর্তীকালে অট্টালিকার তত্ত্ববধায়কের নিকট পাইয়াছিলাম, তৎসত্ত্বেও এই গৃহের নিবাসীগণের প্রতিই যে কেন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শীগণ বিদ্বিষ্ট হইয়াছিলেন তাহা তিনি ব্যাখ্যা করিতে পারেন নাই, আরও বহু ধনী জোতদারগৃহ তো শরিফাবাদে ছিল। সে যাহাই হউক, ভগ্নপ্রায় অট্টালিকাটি আলোকচিত্র লইবার উপযুক্ত ছিল ; এই প্রকার আরও অভিশপ্ত পরিবার ও গৃহাদি অন্যত্র খুঁজিয়া পাইব কিনা নিশ্চিত ছিলাম না । রাজনৈতিক মতাদর্শীগণ প্রকৃতই তাঁহাদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন কিনা, তদ্বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল এবং পরবর্তীকালে তাঁহাদের কার্যকলাপ, চরিত্রদূষণ, হিংসা, প্রতিশোধস্পৃহা ও লোভ দেখিয়া আমার সন্দেহ আরও দৃঢ় হইয়াছে, তাঁহারা বহুলাংশে মতাদর্শ জলাঞ্জলি দিয়া লোভের আবর্তে নামিয়া ভিন্নমতাদর্শীগণের অনুচররূপে দাসখৎ লিখিয়া দিয়াছেন । ইহা মানবসমাজের উত্তর-সত্যের যুগ, নাগরিকগণ ক্রীড়নক মাত্র ।
####
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনের সহিত জমিদার জোতদার তালুকদারদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্হায় তাঁহারা ভূসম্পত্তির নিরঙ্কুশ অধিকারী হন ; স্বত্বাধিকারের সুবিধার সাথে চিরস্হায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় এক নির্ধারিত হারের রাজস্বের জমিদারিস্বত্বও তাঁহারা লাভ করেন।
সেই সময়ের এক উগ্রক্ষত্রিয় জমিদার মহাশয় এই দ্বিতল অট্টালিকাটি নির্মাণ করাইয়াছিলেন । তখন স্নানশালার ফোয়ারার মুখ হইতে গোলাপগন্ধি জলধারা উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকিত এবং সেই শীকরশীতল নিভৃত গৃহের মধ্যে মর্মরখচিত স্নিগ্ধ শিলাসনে বসিয়া, কোমল নগ্ন পদপল্লব জলাশয়ের নির্মল জলরাশির মধ্যে প্রসারিত করিয়া, তরুণী বাঙালি রমণীগণ চুলে জবাকুসম তেল মাখিয়া, স্নানের পূর্বে দীর্ঘ কুঞ্চিত কৃষ্ণকেশ মুক্ত করিয়া দিয়া, রবীন্দ্রসঙ্গীত অথবা অতুলপ্রসাদী গান করিতেন । খণ্ডহরটিতে আজও সেই গানের আবছা রেশ ক্বচিৎ-কখনও বাতাসে ভাসিয়ে বেড়ায় ।
লাহোরে শাহজাদা সেলিমের প্রেমিকা আনারকলিকে যেভাবে সম্রাট আকবরের নির্দেশে ইষ্টক গাঁথিয়া জীবন্ত সমাধিস্হ করা হইয়াছিল, সেই পদ্ধতিতেই এই অভিশপ্ত অট্টালিকাটির সদর দরজার সন্মুখভাগ ইষ্টক গাঁথিয়া বন্ধ করিয়া দেয়া হইয়াছে, গৃহস্হিত উদ্যানটির চতুর্দিকে অবিন্যস্ত অনিয়ন্ত্রিত ঝোপঝাড়, নামহীন লতা সুযোগ পাইয়া সরিসৃপের ন্যায় আঁকিয়া-বাঁকিয়া অন্দরে-কন্দরে প্রবেশ করিয়াছে, দ্বিতলের সিঁড়ি বাহিয়া উপরের ঘরগুলিতে নিজস্ব নৃত্যছন্দে হস্তপদ মেলিয়া দিয়াছে ।
এখন আর সে ফোয়ারা খেলে না, সে গান নাই, সাদা পাথরের উপর শুভ্র চরণের সুন্দর আঘাত পড়ে না — এখন ইহা আমাদের মতো নির্জনবাসপীড়িত সদাভ্রাম্যমান পেশাদার আলোকচিত্রীর অতিবৃহৎ এবং অতিশুন্য সাময়িক বাসস্হান । কিন্তু তত্ত্ববধায়ক এবং আমার শ্যালক উভয়েই আমাকে এই অট্টালিকার একটি পরিত্যক্ত বিজলিহীন ঘরে বাস করিতে বার বার নিষেধ করিয়াছিলেন ; বলিয়াছিলেন, “ইচ্ছা হয় দিনের বেলা থাকিবেন, কিন্তু কখনো এখানে রাত্রিযাপন করিবেন না ; স্পেনের ইনকুইজিশনের কাহিনি শুনিয়াছেন তো, ভিন্নবিশ্বাসী স্ত্রী-পুরুষকে জীবন্ত দগ্ধ করা হইত ? এই অট্টালিকায় দিন নাই রাত্রি নাই সেই অতিনিষ্ঠুর লুন্ঠন-অভিলাষী অগ্নিসংযোগকারীদের উল্লসিত কন্ঠস্বর ধোঁয়ার ন্যায় জাগিয়া উঠে, ছায়াশরীরেরা লুন্ঠনকারীর ন্যায় আমোদনৃত্য করে, আপনি বারুদের গন্ধ পাইলে অবাক হইবার কিছু নাই ।”
আমি হাসিয়া উড়াইয়া দিলাম । তত্তবধায়ক বলিলেন, তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকিবেন, কিন্তু রাত্রে এখানে থাকিবেন না, স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিবেন । আমি বলিলাম, “তথাস্তু” । এই অভিশপ্ত খণ্ডহরের এমন রহস্য ও কিম্বদন্তি ছিল যে, রাত্রে দলীয় মাস্তানগণও এখানে আসিয়া গঞ্জিকা সেবনের আড্ডা দিতে সাহস করিত না , এবং পুলিশও জেল পলাতক কয়েদির অনুসন্ধানে এ-মুখো হইত না। সন্মুখের দ্বার ইষ্টক গাঁথিয়া বন্ধ করিয়া কর্তৃপক্ষ সম্রাট আকবরের ন্যায়ই এই গৃহের জীবনালোক নির্বাপিত করিয়া নিশ্চিন্ত ছিলেন বলিয়া অনুমান করি । একদা এই অট্টালিকা উৎফুল্লকমলজালশোভিত, বিহঙ্গমাক, স্বচ্ছ বারিবিশিষ্ট শান্তিনিকেতন ছিল, তাহা অনুমান করিতেও কষ্ট হয় ।
প্রথম প্রথম গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া লতাগুল্মে আচ্ছন্ন এই পরিত্যক্ত ভগ্নপ্রায় অবহেলিত অট্টালিকার বিজনতা আমার বুকের উপর যেন একটা ভয়ংকর ভারের মতো চাপিয়া থাকিত, সূর্যোদয় এবং দ্বিপ্রহরে খণ্ডহরটির বিবিধ স্হানের আলোকচিত্র তুলিয়া আমি যতটা পারিতাম দ্বিপ্রহরের ভোজনের পর বাহিরে থাকিয়া, শরিফাবাদের অন্যান্য স্হানের আলোকচিত্র তুলিয়া ঘরে ফিরিয়া এক পাঁইট মদ্য সেবন করিয়া শ্রান্তদেহে নিদ্রা দিতাম এবং রাত্রিকালের অপেক্ষা করিতাম ।
দ্বিতল অট্টলিকাটি বন্যলতার ঠাসবুনোটে বসবাসের অযোগ্য হইয়া গিয়াছে, দেয়াল ও গৃহের মাটিতে গুলঞ্চ, পাটেঙ্গা, কালকাসুন্দা, বিছুটি, শেয়ালকাঁটা, ভাটফুল, আলকুশি ইত্যাদি বিস্তার করিয়াছে নিজেদের স্বেচ্ছাচারী গণতন্ত্র । নিবিড় বন নহে, স্হানে স্হানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ মণ্ডলাকারে কোনো কোনো ভূমিখণ্ড ব্যাপিয়াছে । উদ্যান হইতে উইপোকাগণ তাহাদের রানিমার নির্দেশে সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে, দেয়ালে এবং সিঁড়িতে তাহাদের স্বেদ-লালার উত্তরাধুনিক অঙ্কনমালা ।
আলোকচিত্রের ফিল্ম স্হানীয় বিপণীতে রসায়নে মুদ্রণ করিতে দিলে দোকানিটিও আশ্চর্য হইত কিন্তু ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের একটি সংখ্যা তাহাকে দিবার পর একটি পৃষ্ঠায় আমার হাস্যময় মুখ মুদ্রিত দেখিয়া আমাকে সে শ্রদ্ধাপূর্বক সাহায্য করিতে আত্মনিবেদিত হইয়াছিল ।
একদিন না যাইতেই অবহেলিত ভগ্নপ্রায় অট্টলিকাটির এক অপূর্ব নেশা আমাকে ক্রমশ মোহাবিষ্ট করিয়া ধরিতে লাগিল। আমার সে অবস্হা বর্ণনা করাও কঠিন এবং সেকথা লোককে বিশ্বাস করানোও শক্ত । সমস্ত অট্টালিকা একটা সামুদ্রিক অক্টোপাসের ন্যায় আমাকে তাহার আলিঙ্গনের বেগুনি ফুৎকারে ও তীব্র মোচড়ে জঠরোস্হ মোহরসে অল্পে অল্পে যেন নেশাগ্রস্ত করিতে লাগিল ।
বোধহয় এ অভিশপ্ত বাড়িতে পদার্পণমাত্রেই, পরিত্যক্ত ঘরটির খাটে বিছানা পাতিবার ও মশারি টাঙাইবার পর এ প্রক্রিয়ার আরম্ভ হইয়াছিল — কিন্তু আমি যেদিন সচেতনভাবে প্রথম ইহার সূত্রপাত অনুভব করি, সেদিনকার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে ।
তখন গ্রীষ্মকালের কারণে উর্ধাঙ্গের পোশাক খুলিয়া বৈকালিক বাতাসের অপেক্ষা করিতেছিলাম । সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে আমি সেই নদীতীরে ঘাটের নিম্নতলে একটা আরাম কেদারা লইয়া বসিয়াছি । দামোদর নদী শীর্ণ হইয়া আসিয়াছে ; ওপারে অনেকখানি বালুতট অপরাহ্ণের আভায় রঙিন হইয়া উঠিয়াছে, এপারে ঘাটের সোপানমূলে স্বচ্ছ অগভীর জলের তলে নুড়িগুলি ঝিক ঝিক করিতেছে । সেদিন কোথাও বাতাস ছিল না । দ্বিতল অট্টালিকাটির খণ্ডহরের ঝোপঝাড় হইতে বনতুলসী পুদিনা কালকাসুন্দা গুলঞ্চ ভাটফুল আলকুশি ও বন্যঘাসের একটা ঘন বনগন্ধ উঠিয়া স্হির আকাশকে ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়াছিল ।
আকাশে শাদা মেঘ রৌদ্রতপ্ত হইয়া ছুটিতেছে, তাহার নিচে কৃষ্ণবিন্দুবৎ পাখি উড়িতেছে, নারিকেল গাছে চিল বসিয়া, রাজমিস্ত্রির মতো চারিদিক দেখিতেছে, কাহার কিসে ছোঁ মারিবে । বক ছোটোলোক, কাদা ঘাঁটিয়া বেড়াইতেছে । ডাহুক রসিক লোক, ডুব মারিতেছে । আর আর পাখি হালকা লোক, কেবল উড়িয়া বেড়াইতেছে। হাটুরিয়া নৌকা হটর হটর করিয়া যাইতেছে — আপনার প্রয়োজনে । খেয়া নৌকা গজেন্দ্রগমনে যাইতেছে — পরের প্রয়োজনে । বোঝাই নৌকা যাইতেছে না — তাহাদের প্রভূর প্রয়োজন মাত্র ।
দিনমণি অস্তাচলগামী, সূর্য যখন দিগন্তের অন্তরালে অবতীর্ণ হইল, তৎক্ষণাৎ দিবসের নাট্যশালায় একটা দীর্ঘ ছায়াযবনিকা পড়িয়া গেল — এখানে সূর্যাস্তের সময় আলোআঁধারির সম্মিলন অধিকক্ষণ স্হায়ী হয় না । সাইকেল সঞ্চালন করিয়া অথবা সাইকেল-রিকশ ভাড়া করিয়া একবার অঞ্চলটির পথে-পথে বেড়াইয়া আসিব মনে করিয়া উঠিব-উঠিব করিতেছি, কালধর্মে নিশারম্ভেই প্রবল ঝটিকাবৃষ্টি আরম্ভ হইয়া গেল, মস্তকোপরি বৃষ্টির ইলিশগুঁড়ি ধারাপাত হইতেছিল, নিশার সেই ঘোরতর অন্ধকারে দিগম্ত যখন স্হিত হইতেছে, এমন সময়ে সিঁড়িতে একাধিক পায়ের শব্দ ও বহু মানুষের আক্রমণাত্মক “মারো, মেরে ফ্যাল শালাদের, বড়ো বাড় বাড়িয়েছে, জমিজমার মালিক বইল্যা ধরাকে সরা জ্ঞান করতাসে, ধড় থিকা মাথা উড়ায়ে দে, চোখ খুবলাইয়া নে, আগুন ধরাইয়া দে” ইত্যাদি সমবেত কন্ঠস্বরের চিৎকার শুনিতে পাইলাম । আক্রান্ত পুরুষের অস্ফূট আতর্নাদ কর্ণে প্রবেশ করিল, যেনবা কাহারও প্রাণবায়ু নির্গত হইয়া গেল । পিছনে ফিরিয়া দেখিলাম, কেহ নাই । মনের চাঞ্চল্যহেতু একই স্হানে বসিয়া থাকিতে পারিলাম না ।
ইন্দ্রিয়ের ভ্রম মনে করিয়া পুনরায় ফিরিয়া বসিতেই, একেবারে অনেকগুলি পায়ের শব্দ শোনা গেল — যেন বিদ্বেষ ও ঈর্ষায় আক্রান্ত অনেকে মিলিয়া ছুটাছুটি করিয়া তিন-চারিজনকে ধরিবার নিমিত্ত নামিয়ে আসিতেছে । ঈষৎ ভয়ের সহিত এক অপরূপ বিস্ময় মিশ্রিত হইয়া আমার সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল । যদিও আমার সন্মুখে কোনো মূর্তি ছিল না তথাপি স্পষ্ট প্রত্যক্ষবৎ মনে হইল যে, এই গ্রীষ্মের সায়হ্ণে ভয়ে কন্ঠাগতপ্রাণ তিন-চারিটি রক্তাক্ত পুরুষ দামোদরের জলের মধ্যে লুকাইতে নামিয়াছে । জলের তলায় লুকাইয়া তাহারা যেন বিভিন্ন তরঙ্গবিন্যাসে কাঁদিয়া কন্ঠরুদ্ধ আর্তচিৎকার করিতেছিল । এমনই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গিয়াছিলাম যে খেয়াল করি নাই বৃষ্টিতে ঈষৎ ভিজিতেছি ।
যদিও সেই সন্ধ্যাকালে নিস্তব্ধ প্রায়ান্ধকারে, নদীতীরে, নির্জন অট্টালিকায় কোথাও কিছুমাত্র শব্দ ছিল না, তথাপি আমি যেন স্পষ্ট শুনিতে পাইলাম বর্ষাকালের পর্বতের পাথর নামিবার মতো সকৌতুক কলহাস্যের সহিত পরস্পরের দ্রুত অনুধাবন করিয়া ভয়ার্ত ও রক্তাক্ত পুরুষ তিন-চারিটির সন্ধানে আমার পার্শ্ব দিয়া মশাল বহনকারীরা তীর-ধনুক টাঙ্গি দা কাটারি লাঠি কুড়াল পেটরলের ও অ্যাসিডের জেরিক্যান লইয়া দৌড়াইতে দৌড়াইতে চলিয়া গেল, তাহাদের পশ্চাতে উৎসাহ দিবার নিমিত্ত খোল করতাল মৃদঙ্গ ডুগডুগি ঢোলক খঞ্জনি বাদকের দল । আমাকে যেন লক্ষ্য করিল না । তাহারা যেমন আমার নিকট অদৃশ্য, আমিও যেন সেইরূপ তাহাদের নিকট অদৃশ্য । মনে হইল বৃষ্টিও তাহাদের ভয়ে আতঙ্কিত হইয়া মেঘগুলিকে মাথার উপরের আকাশ হইতে নদীর ওই পারে লইয়া চলিয়া গেল ।
নদী পূর্ববৎ স্হির ছিল, কিন্তু আমার নিকট স্পষ্ট বোধ হইল, স্বচ্ছতোয়ার অগভীর স্রোত অনেকগুলি বলয়শিঞ্জিত বাহুবিক্ষেপে বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে ; জনৈক দলপতির নির্দেশে সমবেত যুবকগণ হাসিয়া হাসিয়া অগ্নিসংযোগের জন্য তীরগুলিকে কেরোসিন তেলে চুবাইয়া এই অট্টালিকার দিকে ছুঁড়িয়া মারিতেছে, এবং স্লোগানকারীগনের উৎসাহদানে উগ্রক্ষত্রিয়-গৃহমুখী যুবকগণ হোমারের মহাকাব্যে বর্ণিত গ্রিক সৈন্যগণের ন্যায় ট্রয়ের মানুষদের ধ্বংস করিতে উদ্যত হইয়াছে, কিন্তু তাহাদের পোশাক গ্রিক সৈন্যগণের ন্যায় নহে, তাহারা এতদ্দেশীয় পোশাক শার্টপ্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা পরিয়া, হস্তে তীর-ধনুক দা কাটারি টাঙ্গি লাঠি কুড়াল মশাল জেরিক্যান লইয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল । আপনারা নিশ্চয়ই অবগত যে দলপতিগণ মতাদর্শের উত্তরাধিকারী হইয়া জন্মায়, মানবসন্তান রূপে নহে ।
যদ্যপি কে যে ইহাদের দলপতি তাহা সম্যক বুঝিয়া ফেলা দুষ্কর, কেননা যেখানে সবই কাঁটাবন, সেখানে পুষ্পচয়ন দুঃসাধ্য, তথাপি হইহইকারীদিগকে যে নির্দেশ দিতেছিল, সেই দলপতি কহিল, এতকাল শৃগাল কুক্কুরের মাংস ভক্ষণ করিয়াছি, ক্ষুধায় প্রাণ যায়, আজ নরমাংস খাইব । এই বলিয়া প্রেতবৎ ছায়াসকল অন্ধকারে খলখল হাস্য করিয়া হাততালি দিয়া নৃত্য করিতে লাগিল । চক্ষে চশমা পরিহিত দলপতির বাম হস্তে একটি ক্ষৌরকর্মের পেটিকা ঝুলিতে ছিল, মনে হইল তাহা একটি পুস্তক, বৈদ্যগণের সমাজ-চিকিৎসার বিদেশি গ্রন্হ । বৈদ্যগণের উৎসের সন্ধান মনুস্মৃতিতে নাই । উহারা বর্ণসংকর বলিয়া অনুমান করি, এবং সেহেতু জারজ ও প্রত্যেকের প্রতি বিদ্বিষ্ট । সম্ভবত, দুর্ভাগ্যবশত উগ্রক্ষত্রিয় পরিবারটি বৈদ্য দলপতির ঈর্ষার কেন্দ্র হইয়া উঠিয়াছিল । দলপতি মহাশয় এই জগৎ পবিত্র করিবার জন্য কোন কালসময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, তাহার পিতামাতাই বলিতে পারিবে, ইতিহাস তাহা লিখে নাই, ইতিহাস এইরূপ বদমায়েশদের লইয়া অনেকপ্রকার বদমাইশি করিয়া থাকে ।
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে লিখিয়া গিয়াছেন, “অবস্হাবিশেষে মনুষ্য হিংস্র জন্তু মাত্র।” ছায়াশরীরগণ অট্টালিকাটিতে আয়োজিত অন্নপ্রাশনের শিশুটিকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিলে ঋষির বাণীর অমোঘ সত্যতা উপলব্ধি করিলাম ।
আমার বক্ষের মধ্যে একপ্রকার কম্পন হইতে লাগিল, আতঙ্কে ললাটে স্বেদস্রুতি হইতে লাগিল; সে উত্তেজনা উদ্বেগের কি উৎকন্ঠার কি কৌতূহলের, ঠিক বলিতে পারি না । বড়ো ইচ্ছা হইতে লাগিল ভালো করিয়া দেখি, কিন্তু সম্মুখে দেখিবার কিছুই ছিল না ; মনে হইল ভালো করিয়া কান পাতিলেই উহাদের কথা সমস্তই স্পষ্ট শোনা যাইবে ; কিন্তু একান্তমনে কান পাতিয়া কেবল ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার ঝিল্লিরব শোনা যায় । মনে হইল, পঞ্চাশ বৎসরের অধিক কৃষ্ণবর্ণ যবনিকা ঠিক আমার সম্মুখে আপন মাদকে দুলিতেছে — ভয়ে ভয়ে একটি ধার তুলিয়া ভিতরে দৃষ্টিপাত করি — সেখানে বৃহৎ সালিশি-সভা বসিয়াছে, কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না । সন্দেহ হইল যে এই বায়বীয় অপচ্ছায়াগুলির উপস্হিতির জন্যই হয়তো অট্টালিকাটিকে অভিশপ্ত তকমা দেয়া হইয়াছে ।
হঠাৎ গুমোট ভাঙিয়া হু হু করিয়া একটি বাতাস দিল — দামোদরের স্হির জলতল দেখিতে দেখিতে অপ্সরীর কেশদামের মতো কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, এবং সন্ধ্যাছায়াচ্ছন্ন সমস্ত বনভূমি এক মুহূর্তে একসঙ্গে মর্মরধ্বনি করিয়া যেন দুঃস্বপ্ন হইতে জাগিয়া উঠিল । স্বপ্নই বলো আর সত্যই বলো, অর্ধশতাধিক বৎসরের অতীত ক্ষেত্র হইতে প্রতিফলিত হইয়া আমার সম্মুখে যে-এক অদৃশ্য মরীচিকা অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহা চকিতের মধ্যে অন্তর্হিত হইল । যে আক্রমণকারীগণ আমার দেহের উপর দিয়া শরীরহীন দ্রুতপদে শব্দহীন উচ্চ ক্রোধে ছুটিয়া আসিয়াছিল, তাহারা অট্টলিকাটিতে তীর ও মশাল সংযোগে অগ্নিকাণ্ড ঘটাইয়া দিল । বাতাসে যেমন করিয়া গন্ধ উড়াইয়া লইয়া যায়, বসন্তের এক নিঃশ্বাসে তাহারা তেমনি করিয়া উড়িয়া অদৃশ্য হইয়া গেল । অগ্নিকাণ্ডের তাপের পরিবর্তে আমার ত্বকে শীতস্বেদের বিন্দু ফুটিয়া উঠিতে লাগিল ।
তখন আমার বড়ো আশঙ্কা হইল যে, হঠাৎ বুঝি নির্জন পাইয়া ঠাকুমার ঝুলির রাজকন্যা, রাজপুত্র, রাক্ষস ও দানবগণ আমার স্কন্ধে আসিয়া ভর করিলেন ; আমি বেচারা নানাবিধ আলোকচিত্র তুলিয়া ব্যাখ্যা ও বিক্রয় করিয়া খাই, ঠাকুমার ঝুলির ঠাকুমাটি ঝুলি হইতে রাক্ষস-খোক্কোস ছাড়িয়া দিয়া এইবার বুঝি আমার মুণ্ডপাত করিতে আসিলেন । ভাবিলাম, ভালো করিয়া আহার করিতে হইবে ; শূন্য উদরেই সকল প্রকার দূরারোগ্য ব্যধি আসিয়া চাপিয়া ধরে । অট্টালিকার তত্ত্ববধায়ক মহাশয়কে ডাকিয়া বলিলাম স্বগৃহে যাইবার পূর্বে প্রচুর ঘৃতপক্ক মসলা-সুগন্ধি রীতিমত মোগলাই খানা স্হানীয় খ্যাতনামা রেস্তরাঁ হইতে আনাইয়া দিতে ।
তত্ববধায়ক মহাশয় বিদায় লইলে, পথের দিকের গবাক্ষের কপাট খুলিয়া দেখিলাম, সন্মুখের পথ দিয়া যাইবার কালে এক পথচারী, দেখিতে অনেকটা হিন্দু পুরোহিতের ন্যায়, ব্রা্হ্মণ হইবেন বলিয়া মনে হইল, অতি দীর্ঘাকায় পুরুষ, শরীর শুস্ক, আয়ত মুখমণ্ডলে শ্বেতশ্মশ্রু বিরাজিত, ললাট ও বিরলকেশ তালুদেশে অল্পমাত্র বিভূতিশোভা, ব্রাহ্মণের কান্তি গম্ভীর ও কটাক্ষ কঠিন, আমাকে এই অভিশপ্ত অট্টালিকায় দেখিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল, “তফাত যাও, তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য।” অনুমান করিলাম, বৃদ্ধ পুরোহিত হয়তো পাগল হইয়া গিয়াছেন, অথবা গলায় শালগ্রামশিলা ঝুলাইয়া হাঁটিবার সময়ে অমন চিৎকার করিয়া থাকেন । তৎসত্তবেও তিনি কলেজফেরত জিনস ও টপ পরিহিতা যুবতীগণের প্রতি অলক্ষ্যে চাহিয়া লইতেছেন ।
রাত্রিশেষে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা দিগন্ত ব্যাপ্ত করিয়াছিল, দিনমণি দিগন্তে উদিত হইলে, প্রাতঃকালে সমস্ত ব্যাপারটি পরম হাস্যজনক বলিয়া বোধ হইল । অদ্য আবহাওয়া মনোরম ছিল, প্রদোষকালে যৎসামান্য ঝটিকাবৃষ্টি হইয়া গিয়াছে । আনন্দ মনে শহরের বড়ো কোম্পানির আধিকারিকের মতো শার্ট ও গ্যালিসদেয়া প্যাণ্ট পরিয়া, সাইকেল সঞ্চালন করিয়া, দ্রুতবেগে আপন দৈনন্দিন কার্যে, অর্থাৎ পোস্টাপিসে গিয়া আলোকচিত্রগুলি অনুমোদনের নিমিত্ত পাঠাইয়া দিলাম, প্রবন্ধটির খসড়া লিখিবার জন্য একপ্রস্হ ফুলস্কেপ কাগজ কিনিলাম । সেই দিন প্রবন্ধটি আরম্ভ করিবার জন্য অট্টালিকায় নিজ ঘরে ফিরিয়া একাগ্রচিত্তে লিখিবার কথা । কিন্তু সন্ধ্যা হইতে না হইতেই আমাকে দ্বিতল ভগ্নপ্রায় অট্টালিকাটির রহস্য চুম্বকের ন্যায় টানিতে লাগিল । কে টানিতে লাগিল বলিতে পারি না ; কিন্তু মনে হইল, আর বিলম্ব করা উচিত হয় না । মনে হইল, অট্টালিকাটিতে কোনো পূজা অথবা শিশুর নামকরণের অনুষ্ঠান আরম্ভ হইতেছে, ধুপ-ধুনা চন্দন ও ফুলমালাদির সুগন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে । সেই সন্ধ্যাধূসর তরুচ্ছায়াঘন নির্জন পথ সাইকেল সঞ্চালনের শব্দে সচকিত করিয়া অন্ধকার ভগ্নপ্রায় অবহেলিত নির্জন নিস্তব্ধ অট্টালিকাতে গিয়া উত্তীর্ণ হইলাম ।
সিঁড়ির উপরে সম্মুখের ঘরটিতে মনে হইল দুটি ভাই-বোন গৃহশিক্ষকের নিকট পড়াশুনা করিতেছে, গৃহশিক্ষকের তিরস্কার ও কিশোর কিশোরীর কথাবার্তা কানে আসিতেছিল । সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া দেখিলাম কেহই নাই, ঘরটিতে টিকটিকি , গিরগিটি , চামচিকা ও উইপোকাগণ আশ্রয় লইয়াছে, বন্য লতাও সুযোগ পাইয়া সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া প্রবেশ করিয়াছে । যেন শুনিলাম কিশোর কন্ঠ যাতনায় চিৎকার করিয়া উঠিল, “মাথা ফাটিয়ে দিলো ওরা আমার মাথা ফাটিয়ে দিলো” । সিঁড়ি দিয়া কয়েকজনের দ্রুত নামিবার পদশব্দ শুনিতে পাইলাম কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না । সম্ভবত নিজের পদশব্দকেই ভয়ে অন্যের পদশব্দ বলিয়া ভ্রম করিতেছি । তথাপি কয়েকজনের উচ্চকিত কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম, “এই, মাস্টারটা পাঁচিল ডিঙিয়ে পালাচ্ছে, ধর ধর, পালাতে দিসনি।” শীতের সময়ে নতুন লেপ তৈয়ারির জন্য ধুনিরি লেপের উপর ছড়ি পেটাইয়া খোলের তুলাকে সর্বত্র ছড়াইয়া দেয়, সেই প্রকার শব্দ এবং আর্তচিৎকার, “মরে গেলুম মরে গেলুম মেরে ফেললে মেরে ফেললে”, কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতে লাগিল । অথচ কাহাকেও কোথাও দেখিতে পাইলাম না ; অভিশপ্ত অট্টালিকাটি যেন আমাকেই অভিশপ্ত করিয়া তুলিতেছে এমত প্রতীয়মান হইল ।
বিস্তীর্ণ দালান ও তাহার পার্শ্ববর্তী ঘরগুলি বিশাল ছাদ ধরিয়া রাখিয়াছে । এই প্রকাণ্ড দালান ও তৎপার্শ্ববর্তী ঘরগুলি যেন আপনার বিপুল শূন্যতাভারে অহর্নিশ নিজস্ব আতঙ্কে ছম ছম করিতে থাকে । সেদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে তখনও লন্ঠন জ্বালানো হয় নাই । দরজা ঠেলিয়া আমি একতলার একটি ঘরের কপাট ঠেলিয়া যেমন প্রবেশ করিলাম অমনি মনে হইল ঘরের মধ্যে যেন ভারি একটা বিপ্লব বাঁধিয়া গেল — যেন হঠাৎ সভা ভঙ্গ করিয়া চারিদিকের দরজা জানালা ঘর পথ বারান্দা দিয়া কে কোন দিকে পলাইল তাহার ঠিকানা নাই । আমি কোথাও কিছু না দেখিতে পাইয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম । শরীর এক প্রকার আবেশে রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল । যেন বহুদিবসের লুপ্তাবশিষ্ট বিড়ি-সিগারেট ও নস্যের গন্ধ আমার নাসার মধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল । আমি সেই দীপহীন জনহীন প্রকাণ্ড ঘরের প্রাচীন ইষ্টকপ্রণালীর মাঝখানে দাঁড়াইয়া শুনিতে পাইলাম — ঝর্ঝর শব্দে দুইটি পাশাপাশি চৌবাচ্চায় কেহ স্নান করিতেছে । মনে হইল ট্রানজিসটারে সঙ্গীত বাজিতেছে, কী সুর বাজিতেছে বুঝিতে পারিতেছি না, কোথাও বা গৃহিনীগণের স্বর্ণভূষণের শিঞ্জিত, কোথাও বা কিশোরীর নূপুরের নিক্বণ, কখনোবা পুজার ঘণ্টাধ্বনি বাজিবার শব্দ, অনতিদূরে সানাইয়ে নহবতের আলাপ, বাতাসে দোদুল্যমান ঝাড়ের স্ফটিকদোলকগুলির ঠুন ঠুন ধ্বনি,বারান্দা হইতে খাঁচার বুলবুলের গান, বাগান হইতে পোষা পাখির ডাক আমার চতুর্দিকে একটা প্রেতলোকের রাগিণী সৃষ্টি করিতে লাগিল ।
আমার এমন একটা মোহ উপস্হিত হইল, মনে হইল, এই অস্পৃশ্য অগম্য অবাস্তব ব্যাপারই জগতে একমাত্র সত্য, আর সমস্তই মিথ্যা মরীচিকা । আমি যে আমি — অর্থাৎ আমি যে শ্রীযুক্ত মলয় রায়চৌধুরী, শ্রীযুক্তরঞ্জিত রায়চৌধুরীর কনিষ্ঠপুত্র, আলোকচিত্র তুলিয়া জগতে কিঞ্চিদধিক সুনাম অর্জন করিয়াছি, আমি যে শার্ট-প্যাণ্ট ও বুটজুতা পরিয়া কাঁধে একাধিক ক্যামেরা ঝোলাইয়া আলোকচিত্র লইয়া থাকি, লেন্সের ভিতর দিয়া দৃশ্যাবলীকে অনুপুঙ্খ যাচাই করি, এ-সমস্তই আমার কাছে এমন অদ্ভুত হাস্যকর অমূলক মিথ্যা কথা বলিয়া বোধ হইল যে, আমি সেই বিশাল অন্ধকার ভগ্নপ্রায় অট্টালিকার বন্য ঝোপঝাড়ের মাঝখানে দাঁড়াইয়া হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলাম ।
নিজ ঘরে প্রত্যাবর্তন করিয়া গবাক্ষের কপাট খুলিয়া দেখিলাম, সেই বৃদ্ধ পুরোহিত, লাল শালুতে মোড়া শালিগ্রামশিলা তাঁহার বুকে ঝুলিতেছে, এই ভগ্নপ্রায় অট্টালিকা ছাড়িয়া আমি চলিয়া যাই নাই দেখিয়া সম্ভবত অবাক হইলেন, এবং পূর্বেকার তুলনায় আরও তারস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “ তফাত যাও, তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য ।” তাঁহার শ্লেষপূর্ণ ঘোষণা আমাকে সত্যই গৃহটি সম্পর্কে আরও আগ্রহান্বিত করিয়া তুলিল। আমার ভ্রুকুঞ্চন ও প্রশ্নময় চাহনি দেখিয়া পুরোহিতটি আমার প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া কহিলেন, “অবস্হাবিশেষে মনুষ্য হিংস্র জন্তু মাত্র, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ।” বুঝিলাম যে তিনি বহুবিধ দেবী-দেবতার সেবক, আমার পক্ষে তাঁহার বক্তব্যের নিহিতার্থে প্রবেশ সম্ভব নহে ।
তখনই মোমের আলো নিভিয়া গেল এবং কিয়ৎক্ষণ পর তত্ত্ববধায়ক মহাশয় প্রজ্বলিত কেরোসিন ল্যাম্প হস্তে ঝুলাইয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং টেবিলের উপর রাখিয়া চুপচাপ চলিয়া গেলেন । তিনি আমাকে পাগল মনে করিলেন কিনা জানি না, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আমার স্মরণ হইল যে, আমি শ্রীযুক্ত রঞ্জিত রায়চৌধুরীর কনিষ্ঠপুত্র শ্রীযুক্ত মলয় রায়চৌধুরী, একজন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ; ইহাও মনে করিলাম যে, জগতের ভিতরে অথবা বাহিরে কোথাও অমূর্ত ফোয়ারা নিত্যকাল উৎসারিত ও অদৃশ্য অঙ্গুলির আঘাতে কোনো মায়া সেতারের অনন্ত রাগিনী ধ্বনিত হইতেছে কি না তাহা আমাদের মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবিবর জ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *