পালক

প্রদীপ্ত গুপ্ত

“ হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো;
চারিদিকে পিরামিড – কাফনের ঘ্রান ;

বালির উপরে জ্যোৎস্না – খেজুর-ছায়ারা ইতস্তত

বিচূর্ণ থামের মতো , এশিরিয় – দাঁড়ায় রয়েছে মৃত , ম্লান ।

শরীরে মমির ঘ্রান আমাদের – ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন ;

‘মনে আছে?’ শুধাল সে- শুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন?’ ”

 

বইটা বন্ধ করেই পালককে সরাসরি প্রশ্ন টা করলো সুনীল;

-তা উচ্চ-মাধ্যমিকের তো আর মাস আটেক বাকি ; পড়াশুনা ঠিক করে করছিস তো ?

-হ্যাঁ গো সুনীল দা সব ঠিকঠাকই চলছে !

-যে কবিতাটা একটু পড়লাম সেটা কার লেখা বলত ?

-জীবনানন্দ দাস !

-বাহ খুব ভালো ! বনলতা সেন কবিতার নাম , তোদের পাঠ্যে আছে , কালথেকে এটা পড়ানো শুরু করবো!

সুনীলের মুখ থেকে প্রশংসা পেয়ে পালকের চোখ দুখানি যেন আত্মবিশ্বাসে জ্বলজ্বল করে উঠলো ! সমাজের একদম নীচের স্তর থেকে উঠে আশা মেয়ে এই পালক ! সুনীল যে স্কুলে চাকরি করে সেই স্কুলেই কিছু সমাজকর্মীর সাহায্যে পড়াশুনা করে মেয়েটা ! তার পড়াশুনার প্রতি আগ্রহে মুগ্ধ সুনীল তাই তাকে স্কুলের পর ডেকে নেয় নিজের বাড়িতে , যেখানে ভাড়া থাকে সুনীল! সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তাকে পড়ানো , যাবতীয় বই খাতা কিনে দেওয়া , স্কুলের মাইনে দেওয়া – এসমস্ত কাজ নিজেই করে সুনীল ! মেয়েটাও মাঝে মধ্যে বলে “তুমি না থাকলে এসব কে করতো বল সুনীল দা!” ২২ বছর বয়সী গ্রাম্য ছেলে ও সদ্য চাকরি তে যোগ দেওয়া সুনীলই যেন পালকের সব স্বপ্ন গুলোকে খুব যত্নে লালন পালন করছে !

বস্তির মেয়ে পালকের মা যৌনকর্মী , আর পালকের বস্তি টাও খুব নোংরা , চারিদিকে শুধু নোংরা পুরুষ আর মহিলাদের আনাগোনা থাকতো এছাড়া পরিবেশও ছিল অস্বাস্থ্যকর ! পালককে নিয়ে তাই খুব চিন্তায় থাকতো সুনীল , তাকে অনেকবার সে প্রস্তাবও দিয়েছে তার কাছে থেকে নিজের পড়াশুনাটায় মন দিতে , কারণ সুনীল জানতো যে সেই বস্তিতে পড়াশুনা করাটা খুবই কঠিন ব্যাপার কিন্তু পালক সেই একই উত্তর দিত সবসময় ;

“না গো সুনীল দা তা হয়না ! একেই তুমি আমার জন্য এত করছ তার উপর বাবার অসুখের কথাটা তো তুমি জানোই বল ! সে যে পঙ্গু , আমি ছাড়া যে তার কিছুই নেই , আমি না থাকলে সে যে জলটাও খেতে পারবে না গো , আর মা তো…………”

তারপর আর কথা বলতে পারে না পালক ; চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়ে পড়ে ; নিঃশব্দে ! সুনীলও তার এই যন্ত্রণার কথা অনুভব করে তাকে আর কিছু বলতে পারে না ; মনে মনে সে আবার খুশিও হয় পালকের দায়িত্ববোধ দেখে !

———-

সেদিন সুনীলের খুব জ্বর ; সকাল থেকে বিছানা ছেড়ে উঠতেও পারেনি ; সকাল থেকে প্রায় কিছু না খেয়েই অঘোরে শুধু ঘুমিয়েছে ! বাইরেও সেদিন তুমুল বৃষ্টি ! একটু বেড়িয়ে যে কোনোমতে নিজের জন্য কিছু ওষুধ কিনে আনবে তাও পারেনি সুনীল ! দিন টা ছিল শনিবার ; যথারীতি মধ্যবেলায় স্কুল ছুটির পরই বৃষ্টি পেরিয়ে সুনীল দার বাড়ি চলে এসেছিলো পালক আর এসেই দেখে সুনীল দার এই অবস্থা ! তড়িঘড়ি করে একবাটি জল আর একটা সাদা নেকড়া নিয়ে এসে সুনীলের মাথায় জলপট্টি দিতে লাগে সে ; “কি গো সুনীল দা তুমি তো বড় আক্কেলজ্ঞান হীন মানুষ দেখছি ; একবার স্কুলে ফোন করেও তো জানাতে পারতে ; ভাগ্যিস আমি এলাম!” চিন্তান্বিত হয়ে বলে উঠলো পালক ! মৃদু স্বরে সুনীল বলল “আসলে বৃষ্টিটা , আর ফোন টাও ধরছিল না…..” বেশি কিছু বলতে পারলো না সে ; পালক ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করলো আর তার মাথায় ক্রমাগত জলপট্টি দিতে লাগলো ! সুনীল আধবোজা চোখে পালকের দিকে তাকাল ; প্রবল জ্বরে চারিপাশের দৃশ্যটা কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে উঠেছে সুনীলের চোখে ; বাইরে তখনও বৃষ্টিটা থামেনি ; পালকও প্রায় আধভেজা ; তার ভেজা চুলের মধ্যে থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছিল সুনীলের হাতে !পালকের নিশ্বাসের একটা অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধ সেই তীব্র জ্বরেও সুনীলের ঘ্রানকোষ গুলোকে যেন আনন্দ দিচ্ছিল ! পালককে এত কাছ থেকে কোনদিনও দেখেনি সুনীল , এত স্নিগ্ধতা , এত মমতা ঐ দুটো চোখে এই প্রথম দেখল সে ! হাল্কা নীল রঙের ইউনিফর্ম পড়া মেয়েটা যে কীভাবে কখন সুনীলের মনে অজান্তেই জায়গা করে নিয়েছে তা এই প্রথম অনুধাবন করলো সুনীল !

“তুমি চোখ টা বন্ধ করে একটু বিশ্রাম করো সুনীল দা ; আমি তোমার ওষুধ কিনে আনছি” পাতলা স্বরে বলে উঠলো পালক ! এই চারিদিকে এত জলের মধ্যে মেয়েটা কোথায় ওষুধ আনতে যাবে তা নিয়ে ভাবনা গ্রাস করলো সুনীলকে , কিন্তু কিছু বলে ওঠার আগেই সুনীলকে আশ্বস্ত করে বেড়িয়ে গেলো পালক !

———-

গত দুদিন যাবত পালকের সেবায় আর যত্নে সুনীল এখন প্রায় অনেকটাই সুস্থ ! তবে শরীরে দুর্বলতা রয়েছে সামান্য ! আজ বিকেল অবধিও মেয়েটা এসে কিছুসময় থেকে সুনীলের খবর নিয়ে গেছে ! আর ইতিমধ্যেই পালকের প্রতি সুনীলের অজানা মোহটা যেন সুনীলের হৃৎস্পন্দন ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছে ; “মেয়েটার তো কিছুই নেই , ছোটো বয়স থেকে এই এতদূর এলো শুধু কষ্টের হাত ধরেই , সমাজেও মেয়েটা তাচ্ছিল্য ছাড়া আর কিছুই পায় না , তার উপর ঐ নোংরা বস্তি….. যদি ওকে ভালোবাসি , যদি ওকে নিজের পরিচয় দি , যদি ওকে সঠিক শিক্ষা আর পড়াশুনা করিয়ে বড় করে তুলি….. না এখন কিছু বলব না , আগে ও পড়াশুনা করুক , বড় হোক তারপর না হয়…..”

এসব আদ্যপ্রান্ত ভাবতে ভাবতে সুনীলের হাতটা তার অজান্তেই জানালার বাইরে চলে যায় , ঝিরঝিরে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো তার হাতটাকে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে – অনেকটা পালকের সেই ভেজা চুল থেকে ঝরে পড়া জলের মতোই ! নিজের মনেই হাসতে থাকে সুনীল , হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ে ! ঘড়ির দিকে তাকাল সুনীল , এগারোটা , এই বৃষ্টিতে এতো রাতে আবার কে ! দরজা খুলতেই সে দেখে একটা ভয় মেশানো উত্তেজিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেবরূপ , সুনীলের স্কুলেরই এক ছাত্র ! কি ব্যাপার দেবরূপ এত রাতে…… সুনীলকে শেষ করতে দিল না দেবরূপ ;

“সুনীল দা পড়তে গেছিলাম , ফেরার সময় বস্তির দিকটা থেকেই ফিরছিলাম , রাস্তা পুরো ফাঁকা ছিল দাদা , দেখি পালক হ্যাঁ সুনীল দা পালককেই দুটো ছেলে কোলপাঁজা করে ঐ পড়ে থাকা জমিটার দিকে নিয়ে যাচ্ছে , সাথে এক মহিলাও ছিল!পালকের জ্ঞান ছিল না সুনীল দা , তুমি কিছু করো…..” দেবরূপের কথা শেষ না হতেই পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিলো সুনীল ! মাথার ঠিক রাখতে পারলো না সে ; “তুমি শিগগির পাড়ার লোকজন কে জানাও দেবরূপ , আমি যাচ্ছি , তুমি সকলকে নিয়ে তাড়াতাড়ি এসো…..” ; “তুমি একা…….” দেবরূপ কিছু বলতে যাচ্ছিলো তার তোয়াক্কা না করেই সাইকেলটা নিয়ে বেড়িয়ে গেলো দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য সুনীল !

———-

-আহ মাসি তোমার মাগিটার জোশ কিন্তু খাসা ! আহা পুরো খাস্তা কচুরি মাসি !

মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে পাশবিক হাসি হেসে বলে উঠলো ওদের একজন ! ওদের সাথে থাকা মহিলাও অট্টহাসি করে উঠলো !

-উফ কি মাল মাইরি ! ঘন তাজা দুধ ; চুদে মজা…..

দ্বিতীয় জনের কথা আর শেষ হল না , তীব্র রডের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে ! ঠিক পিছনে রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়িয়ে ছিল সুনীল , তার লাল চোখ থেকে যেন রক্ত মাখা আগুন ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে !

“এই খানকির ছেলে…” বলে যে লোকটা মাটি খুঁড়ছিল সে এগিয়ে এলো এবং পরিণতি সেই একই হল , তীব্র রডের আঘাত এসে পড়লো তার ঘাড়ে এবং তার নিস্তেজ শরীর টাও কাঁদা ভরা মাটিতে পড়লো ! এসব দেখে পালকের “মা” তথা ওদের “মাসি” নিজেকে বাঁচাতে প্রাণপণে দৌড়ে ছুটে বেড়িয়ে গেলো সেই পতিত জমি থেকে ! সুনীলের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ মাত্র নেই , তার দৃষ্টি তখন পালকের নিথর দেহের দিকে , অমানুষিক অত্যাচারে দেহটা কুঁকড়ে পড়ে আছে একটু দুরেই , প্রকৃতি মায়ের কান্না যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে তার উপর ! হাঁটু গেঁড়ে পালকের সামনে বসে পড়লো সুনীল , তার কাছে হয়তো তার আশেপাশের পৃথিবীর কোন মানে নেই তখন ! দেহটাকে কোলে তুলে পালকের পাতলা ঠোঁট দুটোতে একটা আলতো চুম্বন করলো সুনীল আর অতি যত্নে জড়িয়ে নিলো সেটাকে নিজের ভিজে বুকে ! সুনীলের পিছনে ইতিমধ্যে বেশকিছু লোকজন এসে জুটেছে , অনেক ছাতা আর টর্চের আলোর সমাগম , তাদেরই একজন কেউ বলে উঠলো

“পুলিশে খবর দাও গো বিমল দা , এক্ষুনি!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *