ভাইরাস যখন বিশ্বাস

নীলাদ্রি নিয়োগী

-এটা কি সম্ভব?

-বিশ্বাস করুন এটা হয়!

-আচ্ছা ঠিক আছে। তারপর?

-তারপর একটা অবসাদ আমাকে গ্রাস করে।

-সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু আর কিছু হয় না?

-না ডাক্তার বাবু, ফিরে আসার পর শুধুই একটা অনুশোচনা হতে থাকে!

-কতদিন ধরে হচ্ছে এরকম?

-তা প্রায় তিন-চার বছর!

-এতদিন! এর আগে কাওকে বলেননি?

-বলেছি। মানে, কোনো ডাক্তার দেখাইনি। আর আমি তো বিয়েটিয়ে… মানে একাই থাকি। তবে, ওই একজন দুজন কাছের বন্ধুকে বলেছিলাম।

-ঠিক ক’জনকে বলেছেন মনে আছে?

-ওই… হ্যাঁ, দুজনকেই। একজন স্কুলের আর একজন কলেজের বন্ধুকে।

-তারা কী বলেছিল?

-স্কুলের বন্ধু, সুজিত তো হেসেই উড়িয়ে দিল! তারপর পুরোটা ভেঙে বললাম। সব শুনে বললো, এরপর এরম হলে সোজা বসের ঘরে চলে যাবি। কামড়ে, ঘরের ছেলে ঘরে… এই বলে অশ্লীল হেসেছিল!

-বস কি খুব খারাপ লোক?

-না ডাক্তারবাবু। খারাপ বলা যাবে না। তবে বড্ড কড়া। নিজে প্রচুর খাটতে পারেন। ভাবেন সবাই সেরকম পারবে

-তার মানে অফিসে কাজের প্রচুর চাপ! তাই তো?

-হ্যাঁ তা আছে। এর থেকেই কি কোনো হ্যালুসিনেশন টন…

-আপনার কলেজের বন্ধু কী বললো?

-প্রথমে ভেবেছিল ইয়ার্কি করছি। পরে দিব্যি কেটে বলায় পুরোটা মন দিয়ে শুনলো! আপনার মতোই বেশ কয়েকটা প্রশ্নও করলো।

-বাহ। পুরোটা শুনে ওর কী মনে হয়েছিল?

-বিশ্বাস করেনি। তবে কৌস্তভ আবার পত্রিকায় গল্প টল্প লেখে তো। এটা নাকি দারুন একটা গল্পের প্লট হবে! তাই পুরোটা শুনেছিল।

-আর কাওকে বলেননি?

-না ডাক্তার বাবু। এই দুজনকেই যা কথাটথা বলতাম। আর তেমন কারো সাথে… তো এরাই যখন বিশ্বাস করলো না…

-আপনি সত্যজিত বাবুর ‘খগম’ পড়েছেন?

-না তো! কেন বলুন তো?

-নাহ, এমনিই। আর হলিউডের ছবিটবিও নিশ্চয়ই বিশেষ দেখেন না?

-হলিউড কি, আমি কোনো সিনেমাই তেমন দেখি না! শেষ হলে গিয়ে দেখেছিলাম বোধহয় ‘লাঠি’।  তাও তো প্রায় 20 বছর হয়ে গেছে মনে হয়!

-বুঝলাম। আচ্ছা, ঠিক কী ধরণের ঘটনা ঘটলে এটা বেশি হয় বলুন তো?

-দেখুন ডাক্তার বাবু, আমি এমনিতে কম কথা বলি। কিন্তু মাঝে মাঝে নানান কাজে কর্মে, বা কখনো মন খুব খুশি থাকলে অনেক বেশি কথা বলে ফেলি। সেসব দিন এটা হয়। আজকাল দেখছি বেশ ঘনঘন হচ্ছে! আবার উল্টোটাও হয়! মানে ধরুন মন মেজাজ খারাপ থাকলেও হয়। কোনো কোনো ছুটির দিনটিনে তো সারাদিন ওভাবেই কেটে যায়!

-হওয়ার ঠিক আগে কিছু মনে হয়? মানে তখন আপনার মনে ঠিক কী চলতে থাকে বলতে পারেন?

-নাহ সেভাবে মনে পড়ে না। ওই অনেকটা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো… মানে ঠিক কোন মুহূর্তে ঘুমটা এল বা স্বপ্নের শুরুটা কীভাবে হয়, সেগুলো যেমন মনে করতে পারি না, তেমন এটাও…

-তার মানে সম্পূর্ণ হঠাৎ এটা হয়ে যায়?

-নাহ একদম হঠাৎ না অবশ্য! প্রথম প্রথম সেরম হতো। তখন কোনো ধারণাই ছিল না! কিন্তু আজকাল যেন হওয়ার আগে একটু বুঝতে পারি… মানে ধরুন খুব মুড অফ। নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে! তখন বুঝতে পারি… কেমন যেন শরীরে একটা অস্বস্তি, অস্থিরতা… সেই সময় অনেকবার অন্য কিছু ভাবতে চেষ্টা করেছি। কাজ করার চেষ্টা করেছি। বাড়ি থেকে বেরিয়েও গেছি! কিন্তু বেরিয়ে গিয়ে দেখছি হয়ে গেছি! আজকাল তো সময়ও দিচ্ছে না! যখন তখন…..

-বিয়ে করেননি কেন?

-অ্যাঁ? বিয়ে? ওই আর কী! হয়ে ওঠেনি।

-কাওকে ভালোটালো লাগতো না?

-সেরকম না। মানে আমি বরাবরই একটু একটেরে গোছের! তাই আর… নাহ ডাক্তার বাবু  সেভাবে কাওকে বিয়ের কথা ভাবিনি।

-হুম। আচ্ছা, তাহলে মন ভালো থাকলে আর নয়তো খারাপ থাকলে এটা হয়, তাই তো?

-হ্যাঁ। তবে আজকাল যে কোনো উত্তেজনা হলেই হচ্ছে! সেদিন যেমন খুব মশা কামড়াচ্ছিল। বাজার থেকে কয়েল কিনে আনার কথা ভুলে গেসলাম। তো রাগ হচ্ছিল আবার বিরক্তও লাগছিল। তবে… ওই রাগ হওয়াটুকু অবধিই মনে আছে।

-ঘুমটুম ঠিকঠাক হয়?

-হ্যাঁ, তা হয়।

-মিস্টার বাগচি, আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।

-মানে?

-মানে আপনি শুধু শুধু আমার সময় নষ্ট করলেন!

-আপনার তাই মনে হচ্ছে? এতক্ষণ সব শুনেও আপনার…

-হ্যাঁ সব বানানো। খালি এটাই বুঝতে পারছি না, আমাকে কেন বলছেন!

-আমি, আমি মিথ্যে বলছি?

-জলজ্যান্ত! একটা অবাস্তব, গাঁজাখুরি কথা আমায় বিশ্বাস করতে বলেন?

-বুঝেছি। আপনি আমায় রাগিয়ে দিয়ে দেখতে চাইছেন। আপনি যে একটু হলেও বিশ্বাস করেছেন, তার জন্যই আমি কৃতজ্ঞ ডাক্তার বাবু।

-নাহ, আপনি যথেষ্ট স্মার্ট। তবে আমি আপনাকে রাগাতে টাগাতে চাইছি না। সত্যিই বলছি, আপনার এটা বাস্তবে সম্ভব না। আপনি বানিয়ে বলছেন! আপনার ডিপ্রেশনটা অবশ্য সত্যি। সেটার ব্যাপারে বরং আমরা কথা বলি?

-নাহ থাক। সেটা কোনো সমস্যাই না। তবে… একটা কথা বলবো?

-হ্যাঁ বলুন না!

-আমার এক মামার এটা হতো জানেন! সবাইকে বলেছিল। কেউ বিশ্বাস করতো না! হয় মিথ্যেবাদী নয় পাগল ভাবতো… এমনিতে সব ঠিকঠাক। পুরো সুস্থ। শুধু ওই হয়ে যাওয়ার গল্পটাই কেউ বিশ্বাস করতো না! শেষের দিকে কেমন পাগল পাগল হয়ে যাচ্ছিল! আমার সঙ্গে অবশ্য যোগাযোগ ছিল না। তো… বছর চারেক আগে দেখা হয়েছিল। বাবুঘাটে গিয়ে বসেছিলাম! তখন অনেক কিছু বলেছিল এই নিয়ে! সব শুনে আমার কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। তাছাড়া কয়েকটা ব্যাপার দেখে আরো সন্দেহটা বাড়ছিল!

-কী দেখে?

-বলছি। আমাকে তো বলতেই হবে! আর আপনিও তো এখন বিশ্বাস করছেন…

-আঃ কী দেখে  আপনার সন্দেহ হল?

-দেখলাম পাশাপাশি বসে আছি। কিন্তু মামার মাথার উপরেই এক ঝাঁক মশা। রাস্তার কুকুরগুলো সব মামার পায়ের কাছে এসে কী যেন শুঁকছে… আবার বাড়ি ফেরার পথে দেখি একটা বেড়াল মামার দিকে তাকিয়ে গড়গড় করছে! মামারও দেখলাম চোখের দৃষ্টিটা ঠিক স্বাভাবিক না!

-যত্তসব! গল্প আপনার বন্ধু লেখেন, না আপনি?

-আপনাদের পাড়ার মোড়ে একটা লরি থেকে বালি নামালো, টের পেলেন?

-সে তো সরকারদের বাড়িতে তিনতলা হচ্ছে। দিনরাতই লরিতে করে ইট, বালি, পাথর আসছে। শব্দ পেলেন নাকি? আমি অবশ্য খেয়াল করিনি!

-শব্দ না ডাক্তার বাবু, কাঁপন! মাটিটা কেমন কেঁপে উঠলো টের পেলেন না?

-উফ মিস্টার বাগচি, এটা মাটি না, মোজাইক করা মেঝে! 300 মিটার দূরে মাটি কাঁপলেও সেটা বোঝা সম্ভব না! ভূমিকম্পই ছোটখাটগুলো মিস করে যাই!

-যাই হোক, যা বলছিলাম। ওই মামার উপর সন্দেহ হওয়ায় পরই কথাগুলো কেমন বিশ্বাস করতে লাগলাম। আর তারপর থেকেই আমার…. কিন্তু জানেন, এরপর থেকে দেখলাম মামা আমাকে কেমন avoid করছে! এখন তো দেখলেই সরে যায়। কথাও বলে না। মামির কাছে শুনলাম এখন নাকি মামা আর ওসব কথা বলে না!

-ওকে মিস্টার বাগচি, আপনাকে একটা ঘুমের ওষুধ লিখে দিচ্ছি। ঘুমটা ঠিক হলে দেখবেন অনেক স্ট্রেস কেটে যাবে। তখন আর এসব…

-আসছি ডাক্তার বাবু। শীতে ঘুমটা আমার যথেষ্টই হয়। এই গরমেই যা একটু কষ্ট। কিন্তু সেটার জন্য মনোবিদের কাছে না এলেও চলে। চলি।

 

আরো দু’জন পেসেন্টকে দেখার পর ড. সেন চেম্বার বন্ধ করবেন, হঠাৎ বুঝলেন মাথাটা ঝিমঝিম করছে! নাহ, আজ একটু বেশি সময় ধরে পেসেন্ট দেখেছেন। গত রাতে বসাকদের বাড়িতে পার্টি ছিল। শেষেরটা না নিলেও পারতেন। রাতে ঘুমও ভালো হয়নি। সকালেই রুমিটাকে নিয়ে আবার স্কুলে গিয়েছিলেন। পরীক্ষা চলছে ওর!

সরকারদের বাড়িতে কি সিমেন্ট এল! পায়ের নিচটা কেমন কেঁপে উঠলো মনে হলো!

গায়ে কি rash বেরোচ্ছে? হাত পা চুলকোচ্ছে!

জল তেষ্টা পাচ্ছে! কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে হঠাৎ! মনে পড়লো অনেকক্ষণ কিছু খাওয়াও হয়নি!

এত মশা তো ছিল না চেম্বারে! এসিতে মশা থাকেও না তেমন! সুনীল গর্ধবটা নির্ঘাত ভিজিটরস্ রুমের দরজা খুলে রেখে বেরিয়েছে! পায়ে আবার কী কামড়াল? কাঠ পিঁপড়ে? অসহ্য!

ড. সেন কিছুতেই ভাবতে চাইছেন না! তবু অস্বস্তি হচ্ছে। ভীষণ অস্বস্তি!

পেসেন্টদের নাম লেখার ডায়েরীতে মিস্টার বাগচির ফোন নম্বর পেলেন। কিন্তু ফোনে পেলেন না! সুইচ অফ। ড. সেন এখন এসিতে বসে ঘামছেন।

হঠাৎ ফোন এল। রুমি।

-বাপি,আমার পরীক্ষা ব্যাপক হয়েছে।

-তাই? প্রাউড অফ ইউ রুরু।

-তুমি কখন আসবে? খিদে পেয়েছে। জলদি এসো!

-আসছি বাবু, আজ একটু দেরি হয়ে গেল।

-আর শোনো, একটা দারুন রেসিপি শিখেছি। মাম্মাও হেল্প করবে বলেছে। একটা কন্ডেন্স মিল্ক আর কয়েকটা ক্যাডবেরি এনো তো। ঘরে ফ্রুটস তো আছেই। awesome একটা milkshake করে খাওয়াবো! জলদি এসো না!

-milkshake? না না! কোনো দরকার নেই! দুধে কেমন অ্যালার্জি হচ্ছে আজকাল! বরং আগেরদিন যে উপমাটা করেছিলি, ওটা আবার করিস মা। বেশ হয়েছিল কিন্তু…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *