রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নশৈলী

মৃদুল সান্যাল 

মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীতের তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের গান যে প্রাথমিক পর্যায়ের ভিত্তিভূমি তৈরী করেছে, বর্তমানে তা নিয়ে কোন মতভেদ নেই। রবীন্দ্রনাথের গান রচনার কয়েকটি বিশেষ রীতি ছিল। গানের ভাবের প্রতি লক্ষ রেখে তিনি স্থির করতেন কোন তালের ছন্দে গানটির সুর যোজনা করতে হবে। যেমন- শ্রদ্ধা, বন্দনা, ভক্তি, গম্ভীর ও শান্ত প্রকৃতির গানগুলিতে তিনি হিন্দী চৌতালের ধ্রুপদ গানের রচনা-রীতি অনুযায়ী সরল ও নিরাভরণ সুর যোজনা করতেন। সহজ তালে, একই প্রকার গান রচনার সময়েও দেখা গেছে যে,সুর যোজনা এবং তার গীত-রীতিতে ধ্রুপদের রচনা-রীতির ছাপ। উদ্দীপক ও উল্লাসের কবিতায় যখন সুর বসাতেন, তখন সুরগলি প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে বেশ খানিকটা ব্যবধান রচনা করে ওঠানামা করত। এসব গান মধ্যলয়ের গতিতে গাইতে হয় বাণীর ওপর নির্দিষ্ট ছন্দের ঝোঁক দিয়ে। আনন্দচঞ্চল আবেগের গানে তিনি সুর বসাতেন দ্রুতলয়ের ঘন-সন্নিবিষ্ট ছন্দের ঝোঁকে। হতাশা, বিষন্নতা, বিরহবেদনা, দুঃখ বা কান্নার আবেগের কথায় সুর বসিয়েছেন গড়ানো বা ঢিমালয়ের তালে। কখনো কখনো ঢিমালয়ের তালের বাঁধন দিয়ে এধরনের গানকে ভাঙা বা অনিয়মিত ছন্দে গেয়েছেন।গানের এইরূপ বিচিত্র ভাবাবেগের প্রতি লক্ষ রেখে অনুকূল তালের ছন্দে ও লয়ে শিল্পীরা তাকে যদি কন্ঠে প্রকাশ করতে পারেন তবেই গানের রূপ ও রসটি ফুটে উঠবে সহজে। গান গাইবার সময় এই দিকটির প্রতি দৃষ্টি রাখা প্রতিটি গায়ক ও গায়িকার অবশ্যকর্তব্য।কারণ ভাবের প্রতিকূল তালের ছন্দে পরিবেশিত গানকে বিকৃত গান বলা হয়ে থাকে।

গুরুদেবের গানকে কন্ঠে প্রকাশের সময় কন্ঠস্বর প্রয়োগের কতগুলি ধরন আছে। যেমন- বন্দনা, শ্রদ্ধা, শান্ত, উল্লাস, উদ্দীপন, আনন্দচঞ্চল,দুঃখ, ক্রোধ, বিরহবেদনার ভাবযুক্ত কবিতার আবৃত্তিকালে নানাপ্রকার কন্ঠস্বর প্রয়োগের প্রয়োজন হয়। তেমনি গানের রসভেদে কন্ঠস্বরের হ্রাসবৃদ্ধি অর্থাৎ কখনো মৃদু, কখনো মধ্যবল, কখনো প্রবল, কখনো ক্রমশ মৃদু থেকে ক্রমশ বৃদ্ধি বা ক্রমশ বৃদ্ধি থেকে ক্রমশ মৃদুস্বর কন্ঠের প্রয়োগ করতে হয়। একটানা মৃদুস্বরে বা একটানা প্রবলস্বরে রবীন্দ্রনাথের গান গাইবার রীতি নেই।

 

রবীন্দ্রনাথ তার উদ্দীপক ও গম্ভীর প্রকৃতির গানে তৎসম শব্দকে অধিক স্থান দিতেন। তৎসম শব্দযুক্ত কবিতার আবৃত্তিকালে শব্দগুলিকে গুরুদেব যে রূপে প্রস্বনের দ্বারা উচ্চারণ করতেন, তার গানের সুরযুক্ত তৎসম শব্দগুলির ক্ষেত্রেও তাকে একই উচ্চারণ রীতি অবলম্বন করতে দেখা যায়। তদ্ভব শব্দযুক্ত উদ্দীপক গানও তিনি রচনা করেছেন, কিন্তু তার শব্দকে তিনি তালের ঝোঁকের সঙ্গে, কন্ঠস্বরে বা বাচনভঙ্গিতে এমন জোর দিয়ে উচ্চারণ করতেন যে, তার দ্বারা সমগ্র গানের ভাবরূপটি সহজে প্রকাশিত হবার সুযোগ পেত।

 

আহা, অহো, আঃ, আয়, এস, ওগো, কী, কেন, চলো, ছি, দে, ডেকো না, তুই থাক, ধর, ধিক, না, যাও, যাক, হা, হাগো, হারেরে রে, হাই, হাঁচ্চো, হায়, হো, হে প্রভৃতি বহুরকমের শব্দ গুরুদেবের নানাপ্রকার হৃদয়াবেগের গানে আমরা পাই।

কিন্তু এর যে কোন একটি শব্দকে তিনি যখন ক্রোধ, দুঃখ, বিস্ময়, আনন্দ, বেদনা প্রভৃতি আবেগের গানে বসিয়েছেন, তখন সেটিকে কোন অর্থে ব্যবহার করেছেন তা ভালো করে বুঝে সুর সহযোগে ভাবানুকূল স্বরভঙ্গির সাহায্যে উচ্চারিত হলে শব্দযুক্ত পংক্তি বা সমগ্র গানের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করা সহজ হয়। যে সকল গায়ক-গায়িকা সুরযুক্ত স্বরভঙ্গিতে তা প্রকাশ করতে অক্ষম হবেন, তাদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

গুরুদেবের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যের গান এবং সুরে আবৃত্তিমূলক কিছু গান আছে যা উপরোক্ত এই সকল গীতরীতিতে গাইতে না পারলে তা যে ভাবানুযায়ী গাওয়া হল, সেকথা বলা চলবে না। গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যের ক্ষেত্রে চরিত্রানুযায়ী কথার ভাবের পরিবর্তনের সাথে সাথে ঘন ঘন তাল ও লয়ের পরিবর্তন করতে হয়। সেকারণে এসব নাটকের নানা প্রকৃতির গানগুলো সুরসহযোগে কী ধরনের স্বরভঙ্গিতে এবং ছন্দে ও লয়ে গাইতে হবে তার সুষ্ঠু অনুশীলন আবশ্যক।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের গীতরীতির এ কটিই হলো মূল সূত্র এবং এর সঠিক অনুশীলন গায়ক- গায়িকাদের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন। শিক্ষকদের কর্তব্য হবে গান গেয়ে শিক্ষার্থীকে এই সূত্র কটিকে ভালো করে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করা। কেবল মুখের আলোচনায় বা গ্রন্থের ব্যাখ্যা পাঠের দ্বারা শিক্ষার্থীরা এই গীতরীতিটিকে কখনোই কন্ঠে ধরতে পারবে না। শিক্ষককে ক্রমান্বয়ে সব রকমের গান গেয়ে বোঝাতে হবে গানের প্রকৃত রস বা ভাবটিকে কিভাবে কন্ঠে প্রকাশ করতে হবে

গুরুদেবের যে-কোন গানের সুষ্ঠু পরিবেশনের প্রয়োজন গায়কের অবশ্য কর্তব্য হবে লিরিক কাব্য হিসেবে সমগ্র গানের মূল ভাবটিকে অন্তরে অনুভব করবার চেষ্টা করা এবং গানের প্রতিটি শব্দ ব্যবহারের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা। এছাড়া আবশ্যক, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রাগ-রাগিনী এবং দেশী সুরের মধ্যে নানাপ্রকার লিরিক আবেগ যেভাবে সঞ্চিত আছে তাকে হৃদয়ে গ্রহণ করার শিক্ষা। আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো, উচ্চাঙ্গ এবং লোকপ্রচলিত বিচিত্র তালের ছন্দোজ্ঞান। গানের তালও ভাব প্রকাশের একটি আবশ্যকীয় অঙ্গ। এইরূপ সর্বাঙ্গীণ শিক্ষায় পারদর্শী গায়ক ও গায়িকা হিসেবে যেদিন আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনাতে পারব সেদিনই রসিক শ্রোতাগণ জানতে পারবেন রবীন্দ্রসঙ্গীত কিভাবে গাইতে হয় বা রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়নশৈলী।

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *