চোখ

স্নেহা সেন

১)

-“অতঃপর মেয়েটার কি হল”?

সম্প্রীতি: আমি স্পষ্ট দেখলাম, পিঠে ব‍্যাগ নিয়ে নন্দিনী আমার দিকে ফিরে একবার হাসলো।তারপর এই ব‍্যস্ত কলকাতার ভীড়ে একাই মিশে গেল..

২)

-“আচ্ছা তুমি বলো তো, অতঃপর মেয়েটার কি হল”?

রাই: মেস ঘরের ব‍্যালকনিতে গিয়ে দেখলাম নন্দিনী দিদি খুব কাঁদছে। সেদিন অনেক রাত হয়ে গেল, রান্না করা আছে, তবু খেতে এল না। দু’বছর দুজনে আছি। এরকমটা দিদি কখনো করে না।জানে তো আমি না খেয়ে ওর অপেক্ষা করবো। শেষ যেবার আমার জ্বর হল দিদি সারা রাত আমার মাথায় জলপট্টি দিয়েছিল।আমাকে রাঁধতেই দিতো না বলতো “এইটুকুন মেয়ে তুই কি রাঁধবি?আমাকে তো রাঁধতেই হবে।সে যেমনই হোক তুই খেয়ে নিস।”

নন্দিনীদি ভারী হাসিখুশি মিশুকে মানুষ।আমাদের মাতিয়ে রাখতো একদম।কতো পড়াশোনা করতো।

কেবল গভীর রাতে উদাস একা বসে থাকতো, আর কাঁদতো….

-“আচ্ছা সেদিন কি হল বল”?

রাই: নন্দিনীদি কাঁদছিল ব‍্যালকনিতে।খেতে এল না। আমিও অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেছি। ভোরবেলা উঠে দেখি দিদির নিভাঁজ বিছানা ফাঁকা।ব‍্যালকনিতে গিয়ে দেখি দিদি দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে তখনো।আমি পিঠে হাত রাখতে মুখ তুলে তাকালো।চোখ দুটো জলে ভেজা লাল।

আমি কলেজ চলে গেছিলাম।ফিরে দেখি নন্দিনীদির বিছানায় ছোট্ট এক কাঁচা হলুদ পাখি বসে।লাল চোখ।

-‘কি’?!

রাই: হ‍্যাঁ।তারপর থেকে হলুদ পাখি দেখলেই আমি ছুটে যাচ্ছি। কিন্তু তাদের কারুর চোখ লাল নয়।আপনি তো পুলিশে চাকরি করেন। কখনো যদি খুঁজে পান আমাকে জানাবেন?

৩)

সম্প্রীতি: অজন্তা বেড়াতে গিয়ে দেখি নন্দিনী একা দাঁড়িয়ে বিভোর চোখে মূর্তি দেখছে!আমাকে দেখে হাসলো।তারপর কোথায় হারিয়ে গেল!

৪)

-“আচ্ছা এবার আপনি বলুন তো, অতঃপর আপনার মেয়ের কি হল?”

বাবা: ও সকালে উঠলো, খেলো, তারপর এঘর ওঘর ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

-“ঘুরে বেড়াচ্ছিল”?!

বাবা: হ‍্যাঁ ও অকারন ঘুরে বেড়াতো। অনেক ছবি আঁকতো।গল্পও লিখতো।বড় চঞ্চল আমার মেয়ে।বড় আদরের।

সে দিন আমি বাজার করতে বেরোলাম। ফিরে দেখি ও নাই!

-“আচ্ছা। কোথায় গেল বা কোথায় যেতে পারে আপনি কিছু বলতে পারবেন”?

বাবা: হারিয়ে গেল।

-“দেখুন এভাবে তো শুধু হারিয়ে গেল বলে দিলে সব মিটে যায় না।তাকে তো খুঁজে বের করতে হবে”।

বাবা: সবকিছুর মধ্যে থেকেও তো মেয়েটা হারিয়ে যেতেই চেয়েছিল।তাই গেল।

৫)

সম্প্রীতি: পেলিং গিয়ে দেখি নন্দিনীর মুগ্ধ দু চোখে কান্ঞ্চনজঙ্ঘা ধরা দিয়েছে।একাই ছিল।আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে হাসলো। এগিয়ে গিয়ে দেখি ও নাই…

৬)

-“আচ্ছা রাই, বলতে পারবে নন্দিনীদি কাঁদতো কেন”?

রাই: ভালোবাসা খুঁজতো।সুখ শান্তি স্বস্তি ত‍্যাগ করে ও ভালোবাসা খুঁজতো।

পেয়েছিল?

কি হল চুপ কেন?

বল।

রাই: জানি না।…

সব হারিয়ে ও ভালোবাসতে পেরেছিল।

কিন্তু পেয়েছিল কি?

জানি না।…

অবশ্য ওর ভালোবাসতে পারাটাও তো পাওয়াই!

৭)

সম্প্রীতি: এবার সুন্দরবন গিয়ে দেখি নদীতে ঝুঁকে পড়ে নন্দিনী কি দেখছে! নদীর চোখে সে বোধহয় নিজেকেই দেখছিল।আর তার চোখে নদী দেখছিল নিজেকে।

এবার আর ওর কাছে যাই নি। তাহলেই হারিয়ে যেত।

৮)

-“আচ্ছা আপনি নন্দিনীর বহু পুরানো বন্ধু।

আপনি বলুন তো, অতঃপর মেয়েটার কি হল?”

পুত্তলি: দেখুন আমি স্পষ্ট কথার মানুষ। নন্দিনীর ছোটবেলা থেকেই ছেলে ছেলে বাতিক ছিল।ঢলানি আর কি।বেশ সুন্দরী তো… মানে ওই চমক ঠমক।আমি বাবা ওসব পারি না।

সব ছেলেরা এরকম মেয়েছেলেদের দিকেই দৌড়ে আসে।আসতোও, আর ও নাচাতো।

-“কি রকম”?

পুত্তলি: প্রচুর ছেলে বন্ধু ছিল ওর।মিশতো হাসতো খেলতো। এদিকে বলতো ঠিক মনের মতো মানুষটাকে পাচ্ছে না।আরে একদম ছেলেবাজ বুঝছেন তো। শুধু নাচাচ্ছে আর কি।শিক্ষিত বড়লোক প্রচুর ছেলে ওর পিছনে ঘুরতো।হ‍্যাঁ বললেই বিয়ে।এতেও নাকি উনি মনের মানুষ পাচ্ছেন না!ঢং দেখলে গা জ্বলে যায়।আরে বিয়ে হয়ে গেলে এতো ছেলেদের নিয়ে খেলবে কি করে?তাই করছিল না।আবার কি?

-“রেজাল্ট তো ওর বরাবর খুব ভালো।”

পুত্তলি: আরে ওই আর কি। বছরের পর বছর নষ্ট করলে আমিও গোপালপুরে নয় যাদবপুরে পড়তাম। বিজ্ঞান নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়ে ছেড়ে দিল। সাহিত্য পড়বে।কাব‍্যি করবে। মফস্বলে না পড়ে কলকাতা গেলেন।আরে এখানে তো আর কোন ছেলেই বাকি নাই, এবার নতুন জায়গায় ফাঁদ…

-“আরে হ‍্যাঁ সেসব বুঝলাম। কাজের কথায় আসুন।ও হারিয়ে গেছে। কোথায় গেছে কেন গেছে কিছু জানেন?”

পুত্তলি: তা আমিও তো ওই কথাই বলতে যাচ্ছি।

সব ছেলে ছেড়ে এক ছেলের সাথে প্রেম করলো পাঁচ বছর।সে ডাক্তার।বিশাল বড়লোক।বুঝছেন তো।হুঁ হুঁ। কিন্তু এই মেয়েকে কে বিয়ে করবে?ছেলে অন‍্য এক চাকরী করা মেয়ে বিয়ে করলো। এদিকে নন্দিনী নাকি এর মধ্যেই মনের মানুষ পেয়েছিল!তার বিয়ে হল তবুও ওই মেয়েকে একদিন কাঁদতে দেখলাম না জানেন? এই নাকি ভালোবাসা?

লোক দেখানি বলল, সে নাকি আর কোনদিন বিয়ে করবে না।অন‍্য কাউকে না ভালোবেসে বিয়ে করে কেন তার জীবন নষ্ট করবে?

আমিও বলেছিলাম, “এখন তোর বয়েস আছে, রূপ আছে, এতো ছেলে ঝুলোঝুলি করছে তাদের একটাকে বেছে বিয়ে করে নে। পুরনো জনের জন্য খুব মনকেমন করলে তার সাথে একটু সম্পর্ক রাখ।বল বন্ধু। কিন্তু বিয়েটা করে নে।”

-‘বাঃ!’

পুত্তলি: দেখুন তো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। জেদী, দেমাকি।

আমার কি মনে হয় জানেন তো?

ও তলে তলে আবার কোন বড়লোককে ফাঁসিয়েছে।তার সাথেই পালিয়েছে। আপনাদের খোঁজার দরকার নাই।ও কিছু দিন পর আপনিই ফিরে আসবে….

আপনি চলে যাচ্ছেন?

-“হ‍্যাঁ।

রাইকে বলবো হলুদ পাখির চোখ আর লাল নাই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *