কবিতার অবয়ব

অনিন্দ্য রায়
‘শ্রুতি’ বাংলা কবিতাচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এবং ‘শ্রুতি’ পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনে যুক্ত কবিরা কবিতার প্রকরণগত নিরীক্ষায় কিছু মৌলিক উপাদান নিয়ে এলেন তার মধ্যে কবিতার গঠনের, মুদ্রণের  অভিনবত্ব অন্যতম ।

১৯৬৫ সালের এপ্রিলে প্রথম প্রকাশ পেল শ্রুতি পত্রিকাটি । ষোলো পৃষ্ঠার, প্রকাশক মৃণাল বসুচৌধুরী, এই সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে কারু নাম নেই, কবিতা সম্পর্কে পুষ্কর দাশগুপ্তের একটি গদ্য ও মৃণাল বসুচৌধুরী, অনন্ত দাশ, পুষ্কর দাশগুপ্ত, পরেশ মণ্ডল, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়েই সংখ্যাটি । এই গদ্যটিই এই পত্রিকার এবং এর অন্তর্গত কবিগোষ্ঠীর কবিতাসংক্রান্ত অভিযাত্রাপথটিকে সূচিত করে।

দ্বিতীয় সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৫-র জুলাই মাসে, এটিও ষোলো পৃষ্ঠার।  কবিতার পাশাপাশি দুটি গদ্য, পরেশ মণ্ডলের ‘ভালেরির কাব্যচিন্তা’, ‘কবিতা সম্পর্কে’ পুষ্কর দাশগুপ্ত।

পুষ্কর দাশগুপ্ত লেখেন

মুদ্রণের উন্নত অবস্থায় কবি সম্ভাব্য উপায়ে এবং প্রয়োজন অনুসারে কবিতার বিন্যাসে

দৃষ্টিগ্রাহ্য ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পারেন । … বিশেষ কোনো ছক বা আকারে কবিতাকে

বিন্যস্ত করে কবি তার মানসিক অনুষঙ্গকে সাংকেতিক করতে পারেন।

পাঠকের পক্ষে এই ধরণের মুদ্রণ বিন্যাস দু’ভাবে কার্যকর হতে পারে । কবিতাপাঠের

সময় পাঠকের চোখ এবং কান মিশে যায় ; স্বভাবতই দৃষ্টিগ্রাহ্য বিন্যাসে পাঠক শুধু

চোখেই দেখেন না, কানেও সোনেন এবং তখন দৃষ্টিশ্রুতির যুক্তক্রিয়া কবিতা

উপলব্ধির সহায়ক হয় ।

আধুনিক কবিতার মুদ্রিতপ্রকাশে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা সৃষ্টি বা নতুন বিন্যাসের ব্যাপারে মার্লামে

অ্যাপলিনার, মায়াকোভসকি, কমিংস, অমিয় চক্রবর্তী প্রভৃতি কৃতকর্মা কবির প্রয়াস

স্মরণীয় । এবং মুদ্রণবিন্যাসে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা-সৃষ্টি বাংলা কবিতার চর্চার দ্বারা জীর্ণ হয়নি তা

প্রকরণ হিসেবে অকর্ষিত ভূমির মতোই সম্ভাবনাপূর্ণ ।

১৯৬৬ সালের জুলাই-য়ে শ্রুতির পঞ্চম সংখ্যার শ্রুতি সম্পর্কে কিছু কথা বলা হয়, যা শ্রুতি আন্দোলনের প্রথম ইস্তেহার

….ব্যক্তিগত বিষয়ের জন্য দরকার ব্যক্তিগত রচনারীতি আর রচনাপদ্ধতি এবং রচনার বিষয় অবিচ্ছেদ্য  তাই বিবৃতিধর্মী জীর্ণ প্রকাশপদ্ধতি ত্যাগ করে সবসময়ই উপযুক্ত প্রকাশ-রীতি খুঁজতে হবে, যার মাধ্যমে রচনা করা যায় ব্যক্তিত্বের সেই রহস্যময় পরিমণ্ডল যাতে দৃশ্য-শব্দ-স্বাদ-স্পর্শের ব্যাখ্যাতীত সমন্বয় ।

সবশেষে বলা দরকার যে চরিত্রের স্থবিরতার চেয়ে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনশীলতাই আমাদের লক্ষ্য ।

শ্রুতির ৭ম সংখ্যায় ১৯৬৮-র জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয় ২য় ইস্তেহার । এতে বলা হয় “….রচনা-পদ্ধতি এবং রচনার বিষয় আলাদা কোন ব্যাপার নয় । ব্যক্তিগত জগৎসৃষ্টির জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত উচ্চারণপদ্ধতি । প্রচলিত ছক, ভাষা, ছন্দ সমস্ত অব্যবহার্য । এ সমস্ত ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে । গড়ে তুলতে হবে নতুন উচ্চারণপদ্ধতি । …. সমস্ত মিলিয়ে আমরা এক নতুন সৃজনশীলতার সূচনা করতে চাই; যাতে থাকবে স্রোতের পরিবর্তন প্রবণতা । প্রচলিত চেহারার কিছু রচনা ছাপিয়ে সাময়িক বাহবা এবং পিঠ চাপড়ানো পাওয়ার চেয়ে নতুন সৃষ্টির অস্বীকৃতি, এমনকি ব্যর্থতাও আমাদের অনেক বেশী কাম্য ।”

তৃতীয় ইস্তেহার, ‘শ্রুতি সম্পর্কে’ মার্চ ১৯৬৯-এ ১০ম সংকলনে প্রকাশ পায়। এতে যে পয়েন্ট আকারে বক্তব্য ছিল

১. নতুন ধরণের মুদ্রণবিন্যাসের সাহায্যে কবিতার দৃষ্টিগ্রাহ্য ( Visual ) অনুষঙ্গ সৃষ্টি ।

২. ছেদচিহ্নের বিলোপ। প্রয়োজনীয় স্পেস ও বিশেষ পংক্তিবিন্যাসের মাধ্যমে কোথায় থেমে পড়তে হবে নির্দেশ । কবিতার ভাষায় মুখের কথায় স্বাভাবিক ব্যঞ্জনাসৃষ্টি।

…. “

শ্রুতির মোট ১৪টি সংখ্যা প্রকাশ পায়। শেষটি ১৯৭১-এর অগাস্টে।

বাংলা কবিতায় এই আন্দোলনের প্রভাব যথেষ্টই, বিশেষত ‘নতুন ধরণের মুদ্রণবিন্যাসের সাহায্যে কবিতার দৃষ্টিগ্রাহ্য অনুষঙ্গ সৃষ্টি’তে ।

শ্রুতি আন্দোলনে যুক্ত কবিদের কবিতা যা কবিতার প্রচলিত অবয়বকে অস্বীকার করে নতুন বিন্যাসে কবিতাকে ব্যক্ত করেছে আমরা তার কিছু দেখে নিই।

 

( সূর্যস্তোত্র/  পুষ্কর দাশগুপ্ত/ ‘শ্রুতি’ প্রথম সংকলনে প্রকাশিত)  

 

(প্রদর্শনী / পরেশ মণ্ডল )

 

( কম্পোজিশন ১/ পরেশ মণ্ডল  )

( নেই নেই/ অশোক চট্টোপাধ্যায় )

( ঘষা আয়না / অশোক চট্টোপাধ্যায় ) 

    

শ্রুতির ইস্তেহার ও পুষ্কর দাশগুপ্ত্র গদ্যে অংশ, যেখানে কবিতার অবয়ব নিয়ে বলা হয়েছে, তা-ই শুধু উদ্ধৃত হয়েছে, সম্পূর্ণ টেক্সটগুলি নয়।

ঋণ ঃ  হাংরি, শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, উত্তম দাশ ( মহাদিগন্ত )

পদ্যপত্র, শ্রুতি সংকলন, ২০১৪

পরেশ মণ্ডল শ্রুতির অন্যতম কবি, তাঁর রচনায় চিত্ররূপময়তা নিয়ে আগামী সংখ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *