বাধন

পয় মাহমুদ

বরিশাল হাসপাতালে তাহিয়ার কাছে ছুটে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে রাফির। তাহিয়ার বেশি অসুস্থ হওয়ার সংবাদে পাগলপ্রায় রাফি। বছরখানেক ধরে হাটে পানি হওয়ার কারণে অনেক অসুস্থ তাহিয়া। এমন দুঃসংবাদ বয়ে আনা রাফির সেল ফোন থেকে খবর পেয়ে প্রচন্ড গতিতে দৌড়াতে গিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে ভেজানো দরজায় ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাফি। প্রচন্ড আঘাত লাগে মাথায়, রক্ত গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। তার আকস্মিক আর্তচিৎকারে ছুটে আসে ঘরের সবাই। রাফের চোখে সব ঝাপসা হয়ে আসে, সমস্ত পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে মুহুর্তে, দেহটিও অবশ প্রায়। তাহিয়া যেন বারবার ডাকে, আয় রাফি আয়। আর কিছু মনে নেই রাফির। অনেক সময় পর রাফি অনুধাবন করে সে হাসপাতালের বিছানায়।

রাফির মাথা ঝিম ধরে আছে। প্রচুর রক্তক্ষরণে শরীরের অবস্থাও ভালো নয়। রাফিকেও হাসপাতালে রেখে পরিচর্যা করা হলো। তাহিয়া ও রাফি এক হাসপাতালে হলেও দুই বিভাগে রয়েছে দু’জন। কিন্তু দু’জনের চাওয়া ছিল পাশাপাশি থাকা।

রাফির মুখের দিকে তাকিয়ে তাহিয়ার বেঁচে থাকার আশা জাগে। তাদের  এ বন্ধুত্বের সম্পর্ক কয়েক বছর। সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার চেয়ে অবহেলা বেশি করছে তাহিয়া। কিছুদিন পর রাফি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও তাহিয়ার জন্য মনে আশঙ্কার দানা বেধে ওঠে। তাহিয়া সম্পুর্ণ সুস্থ হবে তো? তাহিয়া নামটাও যেন রাফির জন্য আরেকটা জগৎ। সেই ভিন্ন জগতের মানুষটার জন্য খুব টেনশন হচ্ছে রাফির।

তাহিয়ার দেয়া উপহার নীল রঙ্গের ডাইরিটা অনেকদিন পর রাফি বেডরুমের আলমারি থেকে হাতে নেয়।ওটাই আজ তাদের বন্ধুত্বের জবানবন্ধী, কিছু গোপন তথ্য। প্রতিটা পাতায় তাহিয়ার হাতের ছোয়া জড়িত। কিন্তু তাহিয়ার রোগের কথাটা মনে পড়লেই রাফির হার্টবিট মনে হয় বন্ধ হয়ে যায়। তাহিয়ার রোগটা নিছক রোগ নয়, অত্যন্ত জটিল। তাহিয়া বাধনে জড়াতে চাচ্ছে না, কিন্তু রাফি তাহিয়ার পাথরের মত শক্ত মনে ভালোবাসার ফুল ফোটাতে চেয়েছিল। ভেবেছিল একবার যদি ফুল ফোটাতে পারে সেই ফুল সারাজীবন সুবাস দিবে।

কঠিণ রোগের কারণে তাহিয়া ছক বাধা জীবনের গÐি থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছে। সমাজের এই সীমারেখা সমীকরণ থেকে মুক্তি পেতে ওপারে শান্তির শে^ত কপোতের সাথে আলিঙ্গণ করতে চাচ্ছে। তাহিয়া ভাবে, যাবার বেলায় মলিন কাহনে গেথে যাবে তার জীবনটি। বাসার ছাদে তারাভরা আকাশের নিচে বসে এমন ভাবনা কতই অদ্ভুত, আরেক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

তাহিয়াকে কেউ বুঝে না, রাফির সাথে বাধন ক্রমশ হালকা হচ্ছে। এই জন্য রাগ অভিমান জমে মনটা পাথর হয়ে আছে। আহ! রাফির সাথে দেখা হয় না কতদিন! তাহিয়া অনেক কিছু বলতে চায় কিন্তু মুখফুটে বলতে পারে না। রাফি হয়তো অনুভব করতে পারে না তাহিয়া কতটা ভালোবাসে। মনের ভাজে ভাজে জমে থাকা দুঃখগুলো প্রকট হয়ে আছে। কিন্তু সব সময় তো তাহিয়া অবহেলা দেখায়ে আসছে। তাইতো যোগাযোগ নেই কারো সাথে। রাফিও এই বাধনে পিছপা দিছে, কারণ সে মনে মনে বলে, এই অবুজ মনের চাওয়া সামান্য হলেও পুরন হবার পথ দেখা যাচ্ছে না। তবু দু’জনার কেন বারে বারে ওই মুখ ভেষে আসে দৃষ্টির সীমানায়।  মন বড্ড বেইমান, নিজের হয়েও অন্যের কথা ভাবে। স্বর্থপরও দেখছি সে।

স্বপ্নে বোনা সোনালী সংসার শুরু হবার পুর্বেই আঘাতে আঘাতে চুরচুর হতে চায়। তাহিয়ার মনে আজ কত শত কথার পানকৌড়ি উকিঝুকি দেয়। ভাব তন্ময়তায় ডুবে তাহিয়া মনে মনে এই সব বাক্যই আওড়াতে থাকে। মনের অস্থিরতা চোখের অশ্রুতে নাইয়ে দিতে চায়। বাধনে আবদ্ধ হওয়ার আগেই বাধন ছিড়ে যেতে চায়।

আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে নিজের বোধটুক উপুড় করে মনকে অনেক শক্ত করছে তাহিয়া। সে পৃথিবীতে থাকতে চায় না, করুণা পেয়ে বাচতে চায় না। যখনই রাফিকে কাছে পেয়েছে তখনই একটা প্রচÐ অভিমান তাদের মাঝে দেয়াল সৃষ্টি করেছে। মনের কপট খুলতে পারে নি নিজ প্রিয় জনের সামনে। ইচ্ছেগুলো উড়ন্ত ডানা সাপটে নিয়েছে নিজেরই বুকের পাজরের ভাজে। তাই এখন আর দুঃখগুলোকে ভাগাভাগি করার সময় নেই। বাচার ইচ্ছাই হারিয়ে ফেলছে। মনে মনে আওড়ায়, কাঠের গুড়োয় করাত চালিয়ে কি লাভ?

পিছনের সেই রঙ্গিণ ফানুস ওড়ানোর দিন শেষ। কি হবে অনুযোগ আর অভিযোগে। সেই সময়টুকো তো আর ফেরানো যাবে না। এখন দোষ কখনও অসুস্থতাকে, কখনও সময়কে, কখনও রাফিকে দিয়ে জীবনের পথ পরিক্রমা তার। কাউকেই দৃঢ়ভাবে আকশির মতো আকড়ে ধরতে চায় না তাহিয়া। মেরুদÐ শক্ত করে পথ চলে।

এ যেন তাহিয়ার অদৃষ্টি। সেই ছোটবেলাই তাহিয়া বুঝতে পেরেছে একলাই পথ চলতে হবে তাকে। শিশুবেলাই বাবা মায়ের সান্নিধ্য না পেয়ে থাকতে হয়েছে নানা নানির কাছে। মাকে কাছে না পেয়ে ছোট্ট শিশু মনের বিকাশে বাধাগ্রস্থ হয়েছে। তার বাবা মা যথাযথ কর্তব্য পালন করছেন; কিন্তু শিমু মন অতশত বোঝে নি। বাবা-মাই তার জগৎ সংসার। তাদের সাথে একত্রে থাকতে চেয়েছে। তার আনন্দ আহ্লাদ বাবা মা। তাই শিশু মনে কাছে না পাওয়ার বেদনা মানতে পারে নি। তাহিয়া চেয়েছিল, বাবা মায়ের সাথে জড়াজড়ি করে থাকতে। যেখানে সুখ দুঃখ আনন্দ ভাগাভাগি করা যায়। সেই সুখ সম্পর্ক থেকে বঞ্চিত তাহিয়া। তার সুপ্ত বাসনা পরিপুর্ণতা পায় নি। তবুও জীবনটা সুন্দর ছিল। তখন বুঝতো না জীবনের মানে কী? ছুটতো না স্বপ্নের টানে। কাদত না কষ্টের কারণে।

মানুষের সব আশাÑআকাক্সক্ষাই পুর্ণ হয় না। সব কর্মই স্বীকৃতি পায় না। সব একজনে পুর্ণ করতে পারে না। তাই অপুর্ণতার স্বাধ বোঝার জন্য অপুর্ণতার প্রয়োজন।

রাফি সবই জানে; কিন্তু ডাইরিতে যা লেখা রয়েছে তাতে মনে হয় সব অজানা তথ্য। এক একটা লাইন যেন এক একটা রহস্য। রাফির এই পাওয়া না পাওয়ার মধ্যে থাকতে চায় না। এ রহস্য যেন বিরক্ত হয়ে উঠছে। হৃদয়ের সাথে এক অদ্ভুৎ বাধনে জড়িয়ে আছে তাহিয়া। কিন্তু ক্রমে ক্রমে তাহিয়ার অবহেলা জিদ ধরে বিদ্রোহি হয়ে উঠছে। কিছুদিন ধরে ভেবে স্বিদ্ধান্ত নিছে রাফি, এই মোহমায়ায় থাকতে চায় না। অন্য মেয়েকে নিয়ে জীবন শুরু করতে চায়। তাহিয়াকে এক মুহুর্ত ভাবতে চায় না। ইসরত নামের এক অসম্ভব সুন্দরী তরুণী তার কাছে পড়া বুঝতে আসে। রাফির মন তার দিকে দেয়ার চেষ্টা করে, তাকে নিয়ে ভাবতে চায়। অনিশ্চিত তাহিয়ার জীবনে এত অবহেলা পেয়ে জড়াতে চায় না। পিছনের স্মৃতিতে পোড়ে পোড়–ক যতই বুক; দুঃস্বপ্নের কিছু সময় মুছে দিতে হয়। সাময়িক শান্তি হারালেও মন, আগামীর পথচলা হবে সুখময়। এই দুঃসময়ের অন্ধকার রাফির জীবনের দ্বার খুলে দিল। নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। মাঝখানের মধ্যে ইসরাতকে বিয়ে করে ফেলে। তাহিয়ার কিছু হবার কথা না; কিন্তু এমন ধাক্কা খেয়েছে যে এমন আঘাত জীবনে মেলে নি।

এমনিভাবে তাহিয়াকে ত্যাগ করে বিনা নোটিসে, আর জড়িয়ে গেল তার ছাত্রি ইসরাতের জীবনে। এভাবেই দিন যায়; সময় গড়িয়েছে সামান্য হলেও। রাফি লজ্জায় তাহিয়ার কাছ থেকে দুরে সরে গেছে; কিন্তু তার মুখে অনুতাপের কোন চিহ্ন নেই। বরং যা হয়েছে সেটাই ভালো হয়েছে। তাহিয়া রাফির বাধন আরও শীতল হতে থাকে। আর ইসরাতকে উৎসাহ এবং ভালোবাসাই উদ্ভুদ্ধ করছে সংসার করতে। সেই ভালোলাগা থেকেই শুরু করল সংসার।

তাহিয়া বড্ড একা হয়ে গেল। তাহিয়ার আশা বিশ^াস ভালোলাগা ভাঙ্গা কাচের চুরির মত চুরচুর হয়ে গেছে। পৃথিবীতে এতো ভাঙ্গা গড়ার জিনিস থাকতে মানুষের মন কেন বার বার ভাঙ্গে। তাহিয়া আজো বুঝে নি, কি মোহে কিভাবে এমন করে রাফি দুরে যেতে পারে। অবশ্য ইশরতও রাফিকে দারুণ ভালোবাসে। তারা একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ইশরাতের বাবা মা অইেশ চেষ্টা করছিল অন্যত্র পাত্রস্থ করতে। কিন্তু সম্ভব হয় নি। রাফির সাথে জুটি বেধেছে। তাহিয়া বুঝেছে, রাফিকে ভালোবেসে বেধে ফেলেছে ইশরাত। ইশরাতকে ভালোবেসে রাফির অনুপ্রেরণাশক্তি জীবনীশক্তি কর্মক্ষমতা বেড়েছে কহুগুন। মেয়েটা অতিতকে মেনে নিয়ে রাফিকে ভালোবেসে ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য পাশে থাকবে। তাহিয়াও স্বীকার করে, আসলেই রাফিকে সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষ ইসরাত।

তাহিয়া ভাবে, আমি কি করব ! আমার এখন কি করা উচিত? পৃথিবী একটা অভিনয়ের অভিজান, যেখানে নেই কোন হৃদয়ের টান, নেই কোন বন্ধুত্বের দাম। আছে শুধু মিথ্যে অভিনয় আর অভিমান।

রাফি ইশরাতকে বিয়ে করছে, তাহিয়া তখন বোবা হয়েছিল। তারা একে অপরকে ছারা বাচবে না, তাই তাহিয়া নাক গলায়নি। ইশরাত আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল, তাহিয়া তাকে বুঝায়ে সব সামলে সহযোগিতা করছিল। কিন্তু তাদের বিয়েতে তাহিয়া বড্ড একা হয়ে পড়ল। অসুখটা যেন দিগুন হয়ে ধরা দিল তার কাছে। কি ভয়ানক একাকিত্ব! বাচতেও পারছে না মরতেও পারছে না। আর দু’য়ের মাঝেও থাকতে পারছে না। সে কি ভয়ানক অস্বস্তি। তাহিয়া কিছু পেল না। জীবন তো কল্পিত স্বপ্নলোকের মত না। ইচ্ছে হলেই পানিতে ভাষতে পারে না। ডানা ছাড়া আসমানে উড়তে পারবে না। সে কারণেই তন্দ্রাচ্ছন্ন কেটে গেলেই হারিয়ে যায় বাস্তবতার মায়া জালে। সেখানে ভাষাও যায় না, উড়াও যায় না। আর রাফিকে পাওয়া তো শুধুই দুর্ভবানা।

তাহিয়ার ভাবনা, এতো খারাপ লাগার কি আছে? কিছু কিছু জিনিস শুধু স্বপ্নেই দেখা যায়। বাস্তবে তা পুরণ কখনোই হয় না। রাফি ও তাহিয়া দু’জনেই স্বধীন ছিল। কারো কাছে কেউ দায়ী নয়। তবুও তারা বন্ধু তো ছিল! একটা বন্ধনে আবদ্ধ তো ছিল! দৃঢ়তার সাথে বললেও আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছে বটে। তাহিয়ার চোখের কোনে অশ্রæর স্পর্শ আচ করছে। রাফির আর প্রয়োজন নেই তাহিয়াকে; তাহিয়ারও প্রয়োজন নেই রাফিকে। তাহিয়া অনেক রাত পর্যন্ত বালিসে মুখ লুকিয়ে কাদে। কিন্তু কেন কাদে! তা সে জানে না। এই পরাজয়ে কত যে দুর্বল করে দিয়েছে।

একদিন তাহিয়ার সাথে রাফির দেখা হয়েছে ক্ষানিক সময়ের জন্য; ইশরাতরও সাথে ছিল। তাহিয়ার চোখের ভাষা বুঝেও না বোঝার ভান করছে। হাসিমুখে বিদায় জানিয়েছে একে অপরকে। তাহিয়া দেখেছে, মেয়েটি দারুণভাবে ভালোবাসে। নিজের সত্তাবিলীন করে মেয়েটি রাফিকে উৎসর্গ করছে তার জীবন। নিজের দিকে ভ্রæক্ষেপ না করে চাদের আলোয় নাইয়ে দিয়েছে রাফিকে। অদ্ভুৎ বাধনে আবদ্ধ তারা। এত ভালোবাসা কখনও দেখে নি সে। ইশরাত মেয়েটা তাহিয়ার স্থান ছিনিয়েনিয়ে বড় স্থানে বসে আছে রাফির জীকনে। একটা মহৎ হৃদয় আছে তার, তাই সে অতুলনীয় ঐশ^র্যেও অধিকারী।

অহংকারী মানুষরা ভালোবাসা পায় না। ভালোবাসা পেলেও তাদের কাছে বেশি দিন থাকে না। কারণ তাদের কাছে ভালোবাসার চেয়ে অহংকারটা বড়। তবু অহংকারি তাহিয়ার রাগ হয়, পাওয়া না পাওয়ার হিসেব সে করে না। তবুও কেন যেন দুঃখ সব কিছু ছাপিয়ে চৈত্রের হুতাশ বাতাসের মতো হু হু করে কেদে ওঠে। জীবনে সব কিছুর অভাব হতে পারে কিন্তু কষ্টের অভাব হয়না। তাহিয়া ভাবে, নিজেকে দোষী করে বাকি জীবনের পথটুক হেটে কি লাভ! সামনের জীবনে সুন্দর সময়গুলো আমি রাখতে চাই। রাফির সাথে আমার কোন দন্ধ নেই। নতুন করে আমার মত বাচতে চাই। কি হবে পিছন ফিরে! অবশেষে জানলো, শুধুই মরীচিকার পিছনে ছুটল। নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করে হেরে গেল। আপন পর হয়ে গেল, স্বপ্ন নষ্ট হয়ে গেল। আর বুকের চাপা কষ্টগুলো পানি হয়ে চোখ দিয়ে ঝড়ে পড়তে লাগল।

তাহিয়ার কাছে পুর্বেও সম্পর্কেও ব্যাপারটি মুখ্য নয়। তাহিয়ার সময়টা খারাপ যাচ্ছে। তবুও বলে, খারাপ সময়টাকে ধণ্যবাদ, কেননা শিখিয়ে যাচ্ছে যে আসল জীবনের মানে কি? তবুও ভাবে, ছোটবেলা থেকে যে সম্পর্কটা তিল তিল করে গড়ে উঠছে। সেই সম্পর্কের ব্যাপারে সবসময় উদাসীনতা ছিল তাহিয়া। চুম্বকের মত আকড়ে না ধরে সব সময় উদাসীনতা দেখায়ে আসছে। এই গাঢ় কষ্টবোধে অনেকটা পরিবর্তন তাহিয়ার। কি এমন অপরাধ ছিল যে, তাহিয়ার অনেক সাহায্যের পরও রাফি বিয়ের দিনকে কেন্দ্র করে বলছিল, তাহিয়া আমার বিয়ের অনুষ্ঠানে তোমার উপস্থিত থাকাটা আমার কাম্য নয়। কথাটা যতই ভাবে ততই বিরহের প্রতি ভালোবাসাটাও বাড়ে।

তাহিয়া সে দিন থেকে কথা বলার ভাষা খুজে পায় না। এক আজলা ভালোবাসার অপ ছিটিয়ে এ আগুন নেভানো যাবে না। রাফির কি দোষ! তাহিয়া যেমন সারাজীবন সম্পর্কে গুরুত্ব দেয় নি। বাধনে জড়িয়েও জড়ায় নি। এখন কেন রাফির ভালোবাসায় নাক গলাবে! কষ্ট করে হঔের একা পথ চলবে। কারণ রাফিকে ছারা চলতে পারবে না বা বচতে পারবে না ভাবছে। সে কিন্তু তাহিয়াকে ছারা ঠিকই বেচে আছে, ভালো আছে, সংসার করছে। নিজেকে অনেক কষ্টে সংবরণ করছে তাহিয়া। চায় না পিছনের দিকে ফিরে চেতে। তারপরও কেন যেন মন টানে সেই দিকে। সে চায় এই মনস্তাত্তি¡ক জটিল অনুভুতি পিছু কাটিয়ে যেতে। ইদানিং অনেক কিছু ভাবায় তাহিয়াকে। তাহিয়ার ছায়াটাই এখন সঙ্গী। আর বাকি সব কিছুই পর। একাকিত্বটাই আসল মনে হয়; বাকি সব কিছু মিথ্যে। যে ছেলেটাকে সব সময় অবহেলা করতে। এখন সেই ছেলেটার জন্য জীবনটা ভেঙ্গে গেছে। তার হৃদয়ে ভালোবাসার অভাব নেই; কিন্তু তাকে ভালোবাসার কেউ নেই।

রাফি বুঝতে পারছে, ইশরাতের শরীরে আরো এক প্রজন্মের উন্মেষ ঘটছে। উত্তরসুরির আগমনী বার্তায় রাফির মন উতালা প্রায়। রাফি ভাবে, কেন এমন লাগছে! সে আমার এমন কে! কেন এত আকর্ষণ! কেনো মনের কোনে নতুন অনুভুতির হিন্দোল!

তাহিয়ার সাথে কতদিন রাফির দেখা নেই। রাফির ব্যাপারগুলো তাহিয়ার মাথায় আজকাল বড় উদ্ভট উৎকট সব চিন্তা এসে ভর করে। যে মানুষ যোজন যোজন দুরে থেকেছে। ছায়া পর্যন্ত মাড়ায় নি। সেই রাফির ওপর কি দাবি আদায় করতে পারে তাহিয়া? দুর থেকে ভালোবাসা দেয়া ছারা।

হাটের অসুখটা আবার বেড়ে উঠছে। হাসপাতালে পড়ে আছে তাহিয়া। রাফি সময় করে একবার দেখতে গেছিল। রাফির যে পিছন ফিরে তাকাবার অবকাশ নেই। তার সন্তান হয়েছে দেখতে চাঁদের মত। রাফির মুখে হাসি ফুটে উঠে। বাগানের ফুলেরা দুলে উঠে। সে এক আনন্দের বান দুলছে সন্তানের কারণে।

তাহিয়ার ঘড়ি চলছে, জীবন কাটছে কিন্তু দুঃসময়গুলো পাল্টাচ্ছে না। জীবন নামক রেলগাড়িটা কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সুখগুলো পালিয়ে গেল, কষ্টগুলো রয়ে গেল। বাস্তবতা এত নিষ্ঠুর বলেই কল্পনার রংগুলো এততো সুন্দর হয়েছিল তাহিয়ার জীবনে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্যবাদী হলো বাস্তবতা। যে কখনোই মিথ্যে স্বান্তনা দেয় না। আর সব চেয়ে বড় মিথ্যেবাদী হলো আবেগ যা সব সময় প্রতারণা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *