আমি এবং সুদর্শনা ঘটিত ভালোবাসা

পিনাকি চক্রবর্তী                                   

রাসবিহারীর মোড়ে দাঁড়িয়ে , আকাশের দিকে তাকাতেই টের পেলাম ; কিছুক্ষণ বাদেই বৃষ্টি নামবে । মেঘ গুলো লুকিয়ে ছিল ,এই মাত্র জড়ো হতে শুরু করেছে । অল্প সময়ের মধ্যেই ,  আকাশের মাঝখানটা রাজনৈতিক দলের সমাবেশের মতন ভারী হয়ে উঠেছে।আমি দেখলাম , এই যে এমন একটা পরিবর্তন ঘটে চলেছে ,চারপাশের মানুষের হুঁশ নেই । রাসবিহারীর মোড়টা থেমে নেই । গাড়ি অনবরত ছুটছে । যেই রাস্তাটা চেতলার দিকে যাচ্ছে , তার মুখেই দাঁড়িয়ে আছি ।

আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না , প্রথমে টিপ টিপ তারপর টপটপ , এখন আবার টপাটপ বৃষ্টি শুরু হল। নিজেকে আড়াল করবার জন্য চারপাশে যখন লোকজন ছুটছে ; আমি দাঁড়িয়ে তাদের এই দৌড়াদৌড়ি উপভোগ করছি । মানুষ খুব অল্পতেই নিজেদের নিরাপদে দেখতে চায় । অল্পেতেই আমরা আপোষ করা শুরু করেছি । মানে নিরাপদে আর দুঃখহীন জীবনের জন্য , চোখের সামনে দেখা অন্যায় কে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় ।

আজ এমনই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছি আমি । বড়বাজারে এক মাড়োয়ারির কাপড়ের  দোকানে ,  ক্যাশিয়ারের কাজ পেয়েছি । প্রায় আটমাস হল । মালিকের এক বোন আছে ।  সুদর্শনা । আমি যেদিন প্রথম কাজের জন্য , ভবানিপুরে মালিকের বাড়িতে যাই ; সুদর্শনা দাদার পাশেই ছিল । প্রথম দেখাতেই আমাকে দেখে মুচকি হাসল । আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম , বুকের ভিতরের গর্জন । ঠিক হয়ে গেল পরের মাস থেকে আমি ক্যাশে বসছি ।   মেয়েরা চাইলে কোন ছেলের সাথে টুইনটি –টুইনটি খেলতে পারে , আবার চাইলে লম্বা টেস্ট ম্যাচ । ভাগ্য ভালো ছিল , অল্প দিনের মধ্যেই আমি মালিকের বোনের নজরে এলাম । আমাদের এই ব্যাপারটা অবশ্য বিরজু বাবু এতটুকু জানতে পারেননি । সুদর্শনা আমাকে বলেছিল , জাতের বাইরে বিয়ে করা সম্ভব নয় । তাই প্রেম চললেও , তার ভ্যালিডিটি  সুদর্শনার হাতে থাকল ।

 

আমার তখন মনে হল , ইস ! আমি খুব খারাপ । এমন একটা সময় মন খারাপ হওয়ার জায়গায় , খুশিতে ভরে যাচ্ছে । কেননা শুরু থেকেই সুদর্শনা আর আমি খোলা মাঠ পেলাম , বাঁধন ছাড়া সম্পর্ক পেলাম , আর আমি নৈতিকতা বর্জনের বিবেকহীনতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির , আগাম সংকেত পেয়েছিলাম ।

প্রথম থেকেই যেন রিলেশনে টেনশন ছিল না। আমরা দেখা করতে শুরু করলাম । সুদর্শনাকে  এলিয়াট পার্কে নিয়ে গেলাম । ভিক্টোরিয়ার বেঞ্চে একটা ছাতার নিচে , দুজনে পাপারিচাট্ খাচ্ছিলাম ; নিজে না খেয়ে , সুদর্শনার মুখে তুলে দিয়েছি । তবে এটা ঠিক সুদর্শনাকে তখনো চুমু খেতে পারিনি । সুদর্শনাই আমাকে সেই সুযোগ দিল না ।

ভারতীয় মেয়েদের লজ্জাটা বেশিই । এই ক্ষেত্রে সুদর্শনাকে নিবিড় করে পেতে বেশ খাটতে হয়েছিল ।  শেষ অব্দি ধরা আমাকে দিলই । প্রায় দুমাসে আমরা অনেকটাই এগিয়েছি । আমি সুদর্শনার দাদার কাছে অনেকটাই বিশ্বস্থ হয়েছি । এমন একটা সময় , সুদর্শনাই ফাঁকা ফ্ল্যাটে আমাকে ডাকল । মেয়েটা আমাকে হয়ত ভালবাসেনা , কিন্তু আমাদের সকলের মধ্যেই আদিম একটা টান থাকেই , রহস্য উন্মোচনের ।

আমি ফাঁকা ঘরে সুদর্শনার শরীরের রহস্য , ওর সামনেই উন্মোচন করলাম । শরীরের স্পর্শকাতর ভাঁজ গুলিতে আমার পুরুষালি আঙুল বিনা পার্সপোর্টে বিচরণ করছিল । আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম , সেই মুহূর্ত গুলিতে সুদর্শনার অনভিজ্ঞ ভীরু চোখ  আনন্দ পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে । আমরা পাক্কা চার ঘণ্টা একসাথে কাটালাম । শুধু সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় বললাম – ‘ এই প্রথম ? ’  সুদর্শনা কিছু বলল না । মনে হল  ঘোরের মধ্যেই আছে ।

প্রথমবার মানুষ কোন কিছু করলেই , একটা ঝোঁক চেপে যায় আরেকবার করবার । অনেক সময় দ্বিতীয়বারের ফাঁদে জড়িয়ে গিয়ে , বিপদ নিজেই চলে আসে ; ডাকতে হয় না । আমি পরের বারে যখন সুদর্শনার কথায় ফ্ল্যাটে গেলাম । সুদর্শনাকে আদর করলাম । বাড়ি ফিরবার সময় লিফটে রাজারামের মুখোমুখি ! পাশে সুদর্শনা । রাজারামের চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছে, আচমকাই হনুমান জিকে দেখে ফেলেছে ।রাজারাম হল , সুদর্শনার দাদা মানে মালিকের খাসলোক । টিকটিকি । বোনের পিছনে ছোকরারা ঘুরঘুর করলেই , মালিকের কানে চলে যায় । আমি জানি আমার ব্যাপারটাও চলে যাবে । হয়ত সামনের মাসে আমি বেকার হয়ে যাব ।

এমনও হতে পারে , সুদর্শনার দাদা আমাকে পুলিশ দিয়ে ঠ্যাঙালো । কেননা শাসক শ্রেণীর হাতে হাত ধরে, কলকাতার ব্যবসায়ি মহল পুলিশকে ব্যাক্তিগত আক্রোশ মেটাতে ব্যবহার করেছে , আগেও বহুবার ; বামপন্থীরাই এই পরম্পরাকে সমৃদ্ধ করেছে । এখন বামপন্থীরা যতই সাধু সাজুক না ,এই সত্য ওদের দলের লোকেরাও জানে । আমি বামপন্থীদের প্রসঙ্গ টানলাম,  কারন  সামনে দেখতে পাচ্ছি জনা পঞ্চাশে ছেলে-মেয়ের দল , ফেস্টুন , প্ল্যাকার্ড নিয়ে হরিবোলের মতন দলীয় স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে। এখন আর বৃষ্টি পড়ছে না ।

হ্যাঁ , সত্যিই সেদিন রাজারামকে দেখে আমি ভয় পেয়েছিলাম । কেননা চাকরি হারানোটা যেমন চিন্তার ব্যাপার , তেমনই সামাজিক সম্মানহানির ব্যাপারটাও হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। তার উপর  মধ্যবিত্ত শ্রেণী আমরা ; অল্পতেই ‘গেল গেল ’ চিৎকার , বাবার শরীরের অবস্থা ভালো নয় । আমি পকেট থেকে পাঁচশ টাকা বের করে , রাজারামের হাতে গুঁজে দিলাম । অপেক্ষা করতে থাকলাম , গল্প কোন দিকে মোড় নেয় ।

 ২

ঠিক দুদিন বাদে ,আজ একটুবেলার দিকে দোকানে গিয়েছিলাম । দোকানের সামনে পাতলা   ভিড় । বুকের ভিতর দপ করে উঠল । কেননা সুদর্শনার কুমারিত্ব নষ্ট করবার ব্যাপারটা যদি ফাঁস হয়ে যায় ! রাজারামকে ঘুষ দিয়েছিলাম বটে , ঘুষটা হজম করতে পেরেছে কিনা জানা নেই । আমি মাথা নিচু করেই ঢুকলাম । আমাকে দেখেই দোকানের মালিক বিরজু আগরওয়াল  ছুটে এলেন , হিন্দি –বাংলা মিশিয়ে বললেন –‘ ফ্রাইডেতে  তুমাকে , সুদর্শনার সাথে দিখা গিয়েছিল ? ’ আমি কিছু বুঝতে পারলাম না । কেননা সত্যি কথাকে অস্বীকার করবার জন্য সাহসের দরকার হয় , আমার সেটাও নেই । মাথাটা কাজ করছিল না ।  আচমকাই আগরওয়াল থলথলে হাত দিয়ে সপাটে মারল , রাজারামের গালে । প্রথমে মনে হল , আমার গালে মারতে গিয়ে রাজারামের গালে পড়েছে । তারপর দেখলাম না , রাজারামকে মারবে বলেই হাত উঠেছিল ।  আগরওয়াল বললেন –‘ ব্যাটার  সাহস দিখো ,বলে কিনা ফ্রাইডেতে তুমাকে আর সুদর্শনাকে আমাদের বউজারের ফ্ল্যাটে একসাথে দেখেছে ! তুমি নাকি রিসওয়াত দিয়েছিলে ;  এই ব্যাপারটা যাতে আমার কানে না আসে ।’  আমি কিছু  বলবার আগেই , আগরওয়াল বললেন –‘ ব্যাটার হিম্মত দিখো । আজ সকালে হামাকে , এই পাঁচশ টাকা দিখিয়ে বলল , তুমি নাকি ওকে বলেছো , তুমার আর ছুটকির কথা আমার কাছে চেপে যেতে । এবার তুমি বল ,টাকা  তুমি দিয়েছিলে ?  ’

আমি দেখলাম সুদর্শনা মাথা নিচু করে থাকলেও আমাকে ইশারা করছে । আমি যাতে  কথাটা চেপে যাই ।  আমি বললাম –‘ হ্যাঁ । টাকাটা আমিই দিয়েছি ।’  জানি এইবার আমার ভবিষ্যতে সাইক্লোন ধেয়ে আসছে । আগরওয়াল চোখ দুটোকে বড় করে বললেন –‘ দেখ , বাবু খানদানি আছেন । একটা ভদ্রলোককে ফাঁসাতে গিয়ে ছিলিস ! আজ আমার হাতে গলদ কাম হয়ে যেত । তোর আর দরকার নেই । ভাগ ইঁহাসে ।’ আমি এখনো বুঝতে পাচ্ছি না । তবে রাজারামের এই অবস্থা দেখে বেশ আনন্দ হচ্ছে । ব্যাটা সাধু হতে গিয়েছিল । এইবার টের পাচ্ছে । আগরওয়াল আমার দিকে তাকিয়ে বলল –‘ সুদর্শনা আমাকে বলেছে , আপনার কাছে রাজারাম বিবির তবিয়তের জন্য রুপাইয়া চায় । আপনি আচ্ছা আদমি , কিছু না বুঝে দিলেন । রুপাইয়া দেঁওয়াটা ছুটকি দেখে লিঁয়েছে । রাজারামকে টাকা বাঁপস দিতে বলে । ’ এইবার ব্যাপারটা মাথায় খেলেছে । সুদর্শনা ধরা পড়বার ভয়ে , পুরো দোষটাই রাজারামের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে । সত্যি সুদর্শনাকে দেখে মনে হয়নি তলে তলে  এতটা এগিয়ে যাবে । রাজারাম আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরল , বলল –‘ হুজুর , আমাকে বাঁচান । নকরি গেলে না খেতে পেয়ে মারা পড়ব । ’ আমি ওকে এতটুকু বাঁচাবার চেষ্টা করলাম না । আমার দায় পড়েনি । সত্যি কথা স্বীকার করলামই না । উপরন্তু এমন একটা ভনিতা করলাম , যেন খুব অপমানিত হয়েছি ।

কিছুক্ষণবাদে আগরওয়াল দুটো মাটির গ্লাসে ঠাণ্ডা ঘোল নিয়ে এলেন । আমার দিকে একটা গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললেন –‘ নিন , কিছু মনে করবেন না । রাজারাম গরীব ছিল , লেঁকিন এমনটা করবে বুঝতে পারিনি।’ আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি। এখন যদি আগরওয়াল সত্যিটা জানতে পারেন , মুহূর্তে ওনার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠবে । আমার এই জামাই আপ্যায়ন হবেই না , উপরন্তু সম্বোধন ‘আপনি’ থেকে ‘তুই’ তে নেমে আসতে পারে । আমি তাতে বিন্দুমাত্র অবাক হবনা । আমি বললাম –‘ শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না । আজ যদি একটু আগে বাড়ি যাই ।’  আগরওয়াল হেসে বললেন –‘ আরে আরে এখনি চলে যান । অসুবিধা নেই । ’ আমার মতন নিরীহ ছেলেকে অহেতুক অপমানিত হতে হল বলে , ওনার ধর্মবোধে লেগেছে ; অপমানের কম্পেনসেশন বা ভর্তুকি বাবদ ছুটি দিলেন । অথচ শরীর খারাপ হলে যদি পাওনা ছুটির থেকে একদিন অতিরিক্ত ছুটি নিলেই , বেতন কাটা যাবে বলেছেন ; বিচিত্র ধর্মবোধে তখন আটকাবে না !

রাস্তায় নেমেই সুদর্শনার ফোন । ‘তুমি , আজ রাসবিহারীর মোড়ে এস । কথা আছে ।’ আমি বললাম –‘ কটায় ? ’ সুদর্শনা বলল – ‘এই পাঁচটা নাগাদ ।’ আমি হেসে বললাম – ‘ ঠিকাছে।’  ফোনের ভিতর দিয়ে চুমুর আওয়াজ করলাম । সুদর্শনা ততক্ষণে ফোন রেখে দিয়েছে । মনে হল সামনে কেউ আছে , তাই হয়ত তাড়াহুড়ো করে ফোন রেখে দিয়েছে ।

এখন সাড়ে পাঁচটা বাজে। দোকান থেকে বাড়িতে, দুপুরে খেয়ে তারপর দেখা করতে এসেছি । আকাশের বুকে সদ্য বিকেলের আলো , জলের মতন ছড়িয়ে পড়ছে । কিছুক্ষণ আগে হাল্কা বৃষ্টি হয়েছিল । পথের পাশে পাতলা জলের রেখা দেখা যাচ্ছে । আমি অপেক্ষা করছি সুদর্শনার জন্য ।

প্রায় পৌনে ছটায় সুদর্শনা এল । ‘এত দেরী ?’ আমি বিরক্তি বোঝালাম । সুদর্শনা বলল –      ‘ এখানে বোকার মতন দাঁড়িয়ে থাকব নাকি ? ’ খুব যে নিখুঁত বাংলায় কথা বলে তা নয় । তবে সুদর্শনার কথা শুনতে ভালো লাগে । আমি বললাম –‘ চলো , লেক মলের দিকে যাই । হাতে সময় নিয়ে এসেছতো । ’ সুদর্শনা বলল –‘ খুব বেশিক্ষণ থাকব না । ভাইয়া মুখে না বললেও, এই ব্যাপারটা ভালো নজরে নেয়নি ।’ সুদর্শনা চুড়িদার পড়ে এসেছে । তাও বেশ জমকালো । মনে হচ্ছে পোশাক থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়ে চোখটা ঝলসে ফেলবে ।

 

আমরা লেক মলের , পাশের গলি দিয়ে এগিয়ে একটা ক্যাফেটেরিয়াতে ঢুকলাম । গরম  কফিতে চুমুক দিতে দিতে কথা হচ্ছিল । সুদর্শনা বলল –‘ রনভির আসছে ।’ আমি বললাম –  ‘ রনভির কে ? ’ সুদর্শনা আমার দিকে তাকিয়ে বলল –‘ ভুল গেঁয়ে তুম । যার সাথে শাদি ঠিক হয়েছে । এন আর আই । এম বি এ করেছে । ’আমি বললাম –‘ তা হলে আমি আউট আর রনভির ইন ! ’ সুদর্শনা আমার হাত ধরে বলল –‘ বেবি , পরিশান হচ্ছ কেন ? আমি তোমার আছি । তুমি শুধু দেখবে ভাইয়া যেন আমাদের সম্বন্ধে কিছু সন্দেহ না করে । বাকিটা আমি দেখে নেব ।’ আমরা বেশীক্ষণ বসলাম না ।

 ৩

পরের দিন দেখি , বিকেলের দিকে আগরওয়াল  সাথে করে একজনকে নিয়ে এসেছে । টানটান চেহারা , ঘিয়ের মতন গায়ের রং , কটা চোখ আর দেখেই মনে হচ্ছে বেশ পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে । আগরওয়াল আমার দিকে তাকিয়ে বলল –‘ বসু , ইনি হচ্ছেন রনভির গুপ্তা । আজ থেকে গদিতে বসবে । এক হপ্তে কে লিয়ে হামি ছুট্টি লিব । ওই সময় আপনি রনভির কে হেল্প করবেন ।’ আমি বললাম –‘ ঠিকাছে ।’

পরের দিন দেখি বেলার দিকে রনভির দোকানে এল । প্রথম যেদিন এসেছিল দামি ব্লেজার পড়েছিল । আজ টিশার্ট আর জিনস (নামি ব্র্যান্ড) পড়েছে । আমাকে বলল – ‘  আপনি কি করেন ? মানে আপনার দায়িত্ব কি?’ পুরো ভাষাটাই চোস্ত হিন্দিতে বলল । হাল্কা হলেও বাংলার ছোঁয়া নেই । আমি বললাম –‘ ক্যাশ সামলাই । সারাদিন দোকানে আয় আর মাল তোলা বাবদ খরচের হিসেব রাখি ।’ রনভির বলল – ‘ এই কাজের জন্য দশহাজার নেন ! এরপর থেকে নিজে যাবেন । যারা আমাদের মাল দেয় তাদের সাথে দরকার পড়লে কথা বলবেন । শুনুন এই সব দায়িত্ব এখন থেকে আপনার । কয়াল কাল থেকে কাজে আসবেনা ।’ আমি ভাবলাম প্রথম দিনে এসেই , একজনের কাজ ছাড়িয়ে দিলেন ! মানুষের সাথে ব্যবসায়িক ভাষায় কথা বলেন । স্বার্থপর আর অর্থলোভী মানুষ । সুদর্শনার সাথে এইরকম একজনের বিয়ে হবে !!

সাতদিন বাদে রনভিরকে দুপুরের দিকে আইনক্সের সামনে দেখতে পেলাম । সাথে সুদর্শনা ছিল । এর মধ্যে সুদর্শনা একবারও ফোন করেনি । আমি ফোন করলে , ব্যস্ত  পাচ্ছিলাম ।  সন্দেহ হচ্ছে , সুদর্শনা ইচ্ছা করেই আমার নম্বরটাকে ব্যস্ত করে দিয়েছে । সত্যি আর ভালো লাগছেনা । মাঝে মাঝে মনে হয় রনভির আমাদের ব্যাপারটা জানে । তাই আমাকে ইচ্ছা করে সকলের সামনে অপমান করে । দোকানের কাজ ছাড়াও ব্যক্তিগত কাজ দেয় , আমার পক্ষে যথেষ্ট অপমান জনক । তাও মুখ বন্ধ করে থাকি। কেননা চাকরিটা আমার দরকার ।

একদিন দুপুরের দিকে টিফিন খাচ্ছি ,দেখি দোকানে আগরওয়াল আর রনভির এল ।      আগরওয়াল আমার কাছে হিসাবের খাতাটা দেখতে চাইল ।‘ বাসু , দশহাজারের গড়বড়  আছে। ’ শিকারির মতন করে পুরো খাতাটার উপর  চোখ দুটোকে  বুলিয়ে নিলেন । বললেন – ‘হ্যাঁ দশ হাজার হিসাব পাচ্ছি না।’ আমি বললাম – ‘দেখি ।’ খাতাটার পৃষ্ঠা উল্টে দেখে বললাম –‘ এই দেখুন , দশ হাজার আমি দুদিন আগেই  গুপ্তা জিকে দিয়েছি । পাশে তারিখ লেখা আছে।’ রনভির বলল –‘ দেখলেন , আমি যা সন্দেহ করেছিলাম তাই হল । কদিন   থেকেই দেখছি গোলমালে ব্যাপারটা । আমার নামে টাকা ধার রেখে , নিজে নিচ্ছে । ’ কথা গুলো যখন বলছিল , রনভিরের দুটো চোখ নিষ্ঠুর আর ধূর্ত বলে মনে হচ্ছে । আমি বললাম –‘আগরওয়াল স্যার আমি সত্যি বলছি টাকাটা রনভিরকেই দিয়েছিলাম ।’ আমার গালে সপাটে  থাপ্পড় এসে পড়ল । আমি বুঝলাম , এমন থাপ্পড়  রাজারামের গালেও পড়েনি । রনভির বলল –‘ আমি একদিনে যা খরচ করি তোর এক মাসের মাহিনা । আমাকে চোর বলবার আগে নিজের অবস্থার কথা ভাব ।’আমি বললাম –‘ অসভ্যের মতন তুই তোকারি করছেন কেন ?  আমার সম্মান আছে ।’এই সময় দোকানে খরিদ্দার থাকেনা । শাটারটা নামিয়ে রনভির গলার কলার ধরে বলল –‘ তোকে পুলিশে দেব চল্ । ’ আমার অবস্থা তখন খারাপ । এখন যদি সত্যিই পুলিশে দেয় , আমি প্রমান করব কি ভাবে ? ওদের মিথ্যাটাই , মেনে নেবে থানা । আমার সব কিছু শেষ হয়ে যাবে । আমি রাজারামের স্টাইলে আগরওয়ালের পা দুটো জড়িয়ে ধরলাম । বললাম –‘ হুজুর মাপ করুন । দয়া করুন । ঘরে বিমার বাপ আছে । দয়া করুন।’

কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পর , আগরওয়ালের মন গলল ।‘ ঠিকাছে , চলে যাও । আর এই বড়াবাজার চত্বরেও যেন না দেখতে পাই । ’

রাস্তায় বাস ধরবার জন্য দাঁড়িয়ে আছি । নিজেকে বিপর্যস্ত বলে মনে হচ্ছে । আমি একটু আড়ালে গিয়ে , সুদর্শনাকে ফোন করলাম । অনেকক্ষণ ফোন বাজবার পর , সুদর্শনা ফোন ধরল । আমি বললাম –‘ আজ তোমার দাদা আমাকে যাচ্ছে তাই বলে অপমান করেছে , চোর বলেছে । রনভিরের বুদ্ধিতেই এগুলো হয়েছে । ছেলেটা সুবিধের নয় । গায়ে হাত তুলেছে । ’ কিছুক্ষণ বাদে খেয়াল হল উল্টো দিকে ,সুদর্শনার গলা –‘ আঁপ কৌন হে ?’ আমি বললাম –   ‘ আমি রাজিব ,বুঝতে পাচ্ছনা ?’ সুদর্শনা নিরুত্তাপ গলায় বলল –‘ দেখুন আমি ঠিক বুঝতে পাচ্ছিনা । আপনি কি দাদার দোকানে নকরি করেন ? ’আমি বললাম –‘ করতাম ।’ সুদর্শনা বলল –‘ দেখো , নেক্সট মন্থ হামার শাদি হবে । ডোন্ট কল মি নেক্সট টাইম । না হলে পুলিশে কমপ্লেন করব ।’ আচমকাই ফোন কেটে দিল ।

সুদর্শনার ব্যবহার , আচমকাই বিনা মেঘে বাজ পড়বার মতন !      রনভিরের উস্কানিতে আগরওয়ালের অপমান আমাকে দুঃখ দিয়েছে ; সুদর্শনা বুঝিয়ে দিল আসলে আমি , ওদের কাছে  একজন কর্মচারী মাত্র । যার ব্যবহার আছে , সম্মান নেই ।

 

আজ অনেক দিন বাদে কেন জানি রাজারামের মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে । জলে ভেজা দুটো ঝাপসা  চোখে , আমি রাজারামের মুখটা কল্পনা করছি । সেই দিন বেচারা সত্যি কথা বলেছিল । নিজের মনিবকে বাঁচাবার জন্য সমস্তরকমের নিরাপত্তা দূরে সরিয়ে , চাকরি থেকে বরখাস্ত অব্দি হল । আজ আমিও মনিবের কাছে সত্যি কথাই বলেছি ।

নিজেকে যতটা অপমানিত মনে হচ্ছে , তারচেয়েও নর্দমার কীট  বলে মনে হচ্ছে । নিজেকে রাজারামের চেয়ে আলাদা ভেবেছিলাম । এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে  আমরা দুজনেই  কর্মচারী ; আসলে আমাদের দুজনের জায়গা মালিকের চোখে সমান ।

আচ্ছা এখন যদি , আচমকাই বাসের মধ্যে রাজারামের সাথে দেখা হয়ে যায় ! আমি ওর পা দুটো জড়িয়ে ক্ষমা চেয়ে নেব ?  না একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে । প্রকাশ্য দিবালোকে , বাসভর্তি লোকজনের সামনে  অশিক্ষিত মজদুর শ্রেণীর পা জড়ানোর মতন , সৎ সাহস আমার নেই । ভাবছি ওকে একটা সিগারেট ধরানোর আহ্বান জানাব । এটা রাজারামের জন্য সম্মানের হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *