ডুব – নো বেড অফ রোজেস

সুব্রত ব্রহ্ম


সিনেমা বা চলচ্চিত্র এমন একটি বিশাল শিল্প সৃষ্টির মাধ্যম, যেটা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সব কয়টি শাখাতেই আলোকপাত করা হয়ে যায়। আর এও মনে রাখতে হবে, একজন সিনেমা প্রেমী মানুষ কিছু কম বোদ্ধা নন। সাধারণ মানুষ যারা মূলত দর্শকশ্রোতা, তারা সত্যিকারের বোদ্ধা বলেই, বিশ্ব চলচিত্র তথা বাংলা চলচিত্রের ইতিহাসে হৃত্বিক ঘটক, অজয় কর, মৃণাল সেন,  সত্যজিৎ রায়, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, দিলিপ রায়, আব্দুলাহ আল মামুন, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, হুমায়ুন আহমেদ, তারেক মাসুদ- প্রমুখদের নাম আজও সোনার অক্ষরে লেখা আছে। একটা সিনেমা একদিকে যেমন মানুষের মনের খোরাক জুটিয়েছে, তেমনি পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে নাম করা সব সুপারস্টারদের। তাদের মধ্যে চলচিত্র পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী গায়ক, গায়িকা, গীতিকার, সুরকা্‌র, স্ক্রীপ্ট রাইটার অনেকেই রয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে মৌলিক গল্প অবলম্বনে তৈরি দীপংকর দীপন পরিচালিত একশন থ্রিলার সিনেমা “ঢাকা এটাক’ আবারো প্রমাণ করেছে, সময়োপগী ভালো কিছু নির্মাণ করা হলে ভালো দর্শক সিনেমা হলমুখী অবশ্যই হবেন। আমাদের দেশে চলচিত্র নির্মানের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং সমৃদ্ধ। একটা সময় ছিলো যখন এদেশের সিনেমার গল্প, অভিনয়, নির্মান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে টলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও একটা সুবাতাস লেগেছিলো। ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’ সিনেমাটি তার উপযুক্ত উদাহারণ। সে যাই হোক, একজন শিল্পি ও শিল্পের দেশ-কাল-সীমারেখার বন্ধনে আবদ্ধ থাকলে চলেনা। তাতে শিল্প ও সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ হয়না। যতো বেশি কাজ হবে, ভাবের আদান প্রদান হবে, ততো বেশি ভালো ভালো কাজের প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। আজকে আমরা আলোচনা করবো বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য একজন চলচিত্রকার মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী নির্মিত বাংলাদেশের জাজ মাল্টিমিডিয়া ও ভারতের এস কে মুভিজের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘ডুব’ সিনেমাটি নিয়ে।

“ডুব” । ছবির শিরোনাম এবং গল্প নিয়ে কিছু গুঞ্জন ও প্রখ্যাত অভিনেতা ইরফান খানের সম্পৃক্ততা নিয়ে সিনেমা প্রেমীদের মনে একটা বিশেষ কৌতূহল তৈরি হয়েছিলো অনেক আগেই। ছবির টিজার, টিভি ইন্টারভিউ, প্রচারণা সবকিছুতেই ব্যাতিক্রম কিছুর একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো। অবশ্যই সেটা ভালো কিছুরই, যেটা ফারুকীর ছবির ক্ষেত্রে তার ভক্তরা সবসময়ই আশা করে থাকেন। আর দশজনের মতোই আমি নিজেও, ‘ব্যাচেলর’ ছবিতে তার নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তার অন্যান্য ছবিগুলিও দেখেছি। সেই আশার জায়গা থেকে ‘ডুব’ সিনেমাটি দেখতে গিয়ে এবারে কিন্তু নিরাশই হতে হলো। নিরাশ এজন্যে নয় যে ছবিটি শুধুই ফ্লপ করেছে বা আশানুরুপ সাফল্য পায়নি। অনেক বিখ্যাত চলচিত্রকারের ছবিও ইতিহাসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু যেটা লক্ষ্য করার বিষয় সেটা হলো, আশি মিনিট ব্যাপ্তির এই ছবিটি দেখে মনেই হয়নি এটা খ্যাতনামা পরিচালক মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর নিজের হাতে তৈরি একটি কাজ।

ছবির গল্প নিয়ে মানুষের মধ্যে আগে থেকেই একটি গুঞ্জন ছিলো। বলা হয়ে থাকে এই ছবির গল্প বাংলাদেশের কোন একজন বিখ্যাত লেখক ও চলচিত্র পরিচালকের জীবনের উপর আধারিত। কিন্তু সিনেমাটি দেখে কোথাও তার সত্যতা, গ্রহনযোগ্যতা খুঁজে পেলামনা। গুঞ্জন যাই হোক, সেটি সত্যি হলেও, গল্পটি নিয়ে কেন পরিচালক খেলতে পারলেন না, কেন আরো বেশি করে একটা জীবনের বিশালত্বের ব্যপকতা তুলে ধরতে পারলেননা আফসোসটা সেখানেই। ছবিতে একজন চলচিত্র পরিচালকের ভূমিকায় দেখা যায় ইরফান খানকে। তার অভিনয় প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রধান চরিত্রের যেটি মূল বিচরণ ক্ষেত্র চলচিত্র নির্মাণ বা লেখালেখি, সে দিকে কোন আলোকপাতই করা হয়নি। ছবিটির গল্প অনুযায়ী একজন চলচিত্র পরিচালক ও তার সুখী সংসার, সন্তান এবং তাদের উপস্থিতিতেই আরেকটি নারী চরিত্রের আগমন ওই পরিচালকের জীবনে, তারপর পরিবারে ভাঙন। স্ত্রী, সন্তানের সঙ্গে বিচ্ছেদ, একসময় ঐ পরিচালকের হটাত মৃত্যু। মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথমা স্ত্রী ও তার সন্তানেরা। মাঝখানে ফ্ল্যাশব্যাক… ফ্ল্যাশব্যাক… ফ্ল্যাশব্যাক…। পরিচালক মনে হয় একটা রহস্যের জাল বুনতে গিয়ে সেই জালে নিজেই জড়িয়ে গিয়েছেন। যেকারনে রহস্যজট খুলে মূল বিষয়টিই ডানা মেলতে পারেনি। তবে ছবির গল্পটি নিয়ে তিনি আরও অনেক অনেক কিছুই করতে পারতেন। কিন্তু কেন পারলেননা বা ছবিটি নির্মানের সময় তার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিলো কি-না সেটাও একটা প্রশ্ন। ছবিটির টেকনিক্যাল দিক গুলিও যারপরনাই দুর্বল। প্রত্যকটি সিকোয়েন্স অসঙ্গতিপূর্ণ, খাপছাড়া। অভিনয়ে অপরিপক্কতা বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত হয়। চলচিত্রের অভিনয়ে যে ধরনের একশন, রিয়েকশন, বডি ল্যাংগুয়েজ থাকা দরকার সেসব একেবারেই অনুপস্থিত। উপরন্তু কোথাও কোথাও ওভার একটিং বিরক্তির তৈরি করেছে। চিত্রগ্রহন, দৃশ্যায়ন, ফ্রেমিং, সম্পাদনা- সব মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সিনেমাটি দেখতে গিয়ে পাবলিক রিকেশনই অনেক কথা বলে দেয়। সমালোচকের জায়গা থেকে বলবো ছবির শিরোনাম ও গল্প নির্বাচন দুটিই যথার্থ ছিলো। কিন্তু পরিচালক তার সদব্যবহার কেন জানি করতে পারেননি। যদিও সুযোগের কোন কমতি ছিলো বলে মনে হয়না। পরিশেষে বলবো মানুষের জন্যই সিনেমা। সিনেমা সময়ের কথা বলে। সিনেমা সময় পরিবর্তনের কথাও বলে। একটি ভালো সিনেমা একটি আধুনিক জেনারেশন তৈরিতেও বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। মৌলিক গল্প, অধ্যাবসায় ও দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আগামী দিনে ভালো ভালো সিনেমা নির্মাণ অব্যহত থাকবে এই আশাবাদ একজন চলচিত্র প্রেমী হিসেবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

 

 

 

 

(ছবি সোর্স – গুগল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *