চিঠির ডায়েরী

রুমেলা দাস 


(২৭শে জানুয়ারি,২০১৫)
চিঠির আজ বড় খুশির দিন।
 ঘন ঘন ইনজেকশন,ডঃ পরেল এর থমথমে মেজাজ কিংবা কি যেন নাম ওই ফাজিল ডঃটার সব কিছুকে মেসির ড্রিপ-লিং এর মত কাটিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে-‘ও আজ মা’।
 এখন আর কোনো যন্ত্রণাই বেদনাদায়ক নয়- শরীরের ওপর অযাচিত অথচ প্রয়োজনীয় ছুরি-কাঁচির দাপাদাপিকে বেমালুম বলে বোধ হচ্ছে।শরীরের সমস্ত ব্যথাগুলো যেন দলবেঁধে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে যে যার খোলসে।খুব সহজ,স্বাভাবিকভাবে সহযোগী নার্স যখন তুলতুলে ছোট্ট মাথাটাকে আলতো হাতে ওর কাছে এনে জিজ্ঞেস করে ‘বলোতো কি হয়েছে তোমার?!’সেই থেকেই ভালোলাগার রঙিন পাখনা গুলো ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেড়াতে শুরু করে চিঠির বুক জুড়ে।যদি দুহাতে ওই ছোট্ট শরীরটাকে বেশ কিছুক্ষণ ছুঁতে পারতো পরম আদরে তবে বেশ হতো।
কেমন যেন হালকা বোধ হচ্ছে চিঠির শরীর জুড়ে।বমি পাচ্ছে,পেট দুমড়ে মুচরে বারবার উঠে পড়তে চাইছে শরীরটা।হঠাৎই অস্পষ্ট আবছা খারাপলাগাগুলো কুন্ডলি পাকিয়ে গলার কাছে এসে জমাট বাঁধতে থাকে।গোটা শরীরটা ঝিম ধরে আসে যেন।বেড এর দুপাশে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে রাখা হাতদুটো খুলে ফেলতে ভীষণ ইচ্ছে করে চিঠির।ওষুধ ইনজেকশন এর গন্ধে ১০/৮-এর ঘরটা আন্দামানের কালকূটরির মতো মনে হচ্ছে ওর।তড়িঘড়ি ব্যাস্ততায় ইনজেকশন পুশ,সদ্য প্রাণের কান্না ছাপিয়ে কয়েক টুকরো কথা ওর কানে ভেসে আসে-‘আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
আপনি ঠিক আছেন তো!’
একগুচ্ছ সুখ,ভয়,আশঙ্কা সবমিলিয়ে অনুভূতির এমন ককটেল মিশ্রণ এর আগে কখনো হয়নি ওর।ঝাপসা হয়ে আসা চোখটাকে টেনে ধরে রাখতে ইচ্ছে করছে,জীবনের সবটুকু যেন একদলা ভাতের মতো আটকে রয়েছে গলায় সামান্য কিছু আঘাত পেলেই বেরিয়ে আসার উপক্রম।না—এমন তো হবার কথা ছিলনা ওর।হিসাবটা এভাবে যে বেহিসাবি হয়ে যেতে পারে,তা স্বপ্নেও ভাবেনি।এখনো অনেক হিসাব বাকি আছে।এভাবে ফাঁকি দিতে পারেনা জীবন।
হিংসার এই পাতালপুরীতে ভালোবাসার পিঠ ঠেকে গিয়েছিল যখন দেওয়ালে,তখন কোন সুদূর মায়াজগতের এক প্রগাঢ় বন্ধন জড়িয়ে ধরেছিল ভালোবাসাকে,ভালোলাগাকে।নিঃশাস নিতে শিখিয়েছিল আবার করে,শরীরের মধ্যে তিল তিল করে বেড়ে ওঠা অঙ্কুর লড়ার সাহস জুগিয়েছিল।হয়তো সমাজের আর এক প্রতিযোগী হিসাবেই।
তুলনা, প্রতিযোগিতা,এগিয়ে যাওয়ার দৌড় এসব চায়নি চিঠি ও তার ভালোবাসা।তবুও বারবার মুখোমুখি হতে হয়েছে এসবের।
থামেনি কেউই বা বলা যায় থামতে দেয় ও নি কেউ।বুঝতে শিখিয়েছে এভাবেই বাঁচতে হয়।ভালোবাসা নয় পঙ্গু হয়ে বাঁচাকেই প্রকৃত বাঁচা বলে,তাতেই সবাই সুখী,সবাই খুশি।
তালে তাল মেলাতে পারেনি ওরা,পিছিয়ে পড়েছে বারবার।ঠাকুরঘর থেকে শুরু করে রান্নাঘর লড়াই করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে।তবুও শক্ত করে ধরে রেখেছে দুটো হাত,পরিবার সমাজের বিষ কখনো আলগা করতে পারেনি তাদের এই বাঁধনকে।
আজ যখন সব না পাওয়ার মাঝে নতুন এক পাওয়া তখন তাকে কোনোভাবেই হারাতে
দেবেনা চিঠি।চিঠি জানে দরজার ওপারে সংকীর্ণ করিডোরটায় দাঁড়িয়ে কেউ যখন ভাবছে নতুন অতিথি কেমন দেখতে হবে! কেউ আবার নিজের সত্তার সাথে তার ভিন্নতার তুলনায় মশগুল, তখন এক কোণে দাঁড়িয়ে কেউ হয়তো ভাবছে-‘আমার চিঠি ভালো আছে তো?!’
চিঠির বড্ড ইচ্ছে করছে ওর হাতটা ছুঁতে-মাথায় বিলি কেটে আগের মতই বলতে ইচ্ছে করছে-‘চিন্তা কোরোনা, আমি ঠিক আছি ভালো আছি’।
(ক্রমশঃ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *