গ্রেগরিয়ান চান্ট পোপ গ্রেগরি (দ্রঃ)এবং সংগীত রচনা পদ্ধতি

মৃদুল সান্যাল 


খ্রীষ্ট ধর্মে আদিকাল থেকেই ধর্মোপাসনায় সংগীতের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে।

গ্রেগরি ছিলেন সুবিখ্যাত রোমান সংগীতশাস্ত্রী ও ধর্মযাজক। সংগীত সংস্কারক রূপে তিনি পাশ্চাত্য সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী গৌরব লাভ করেছেন। রোমান ক্যাথলিক গীর্জাসংগীতের ক্ষেত্রে তার সংস্কার ঐতিহাসিক গুরুত্বলাভ করেছে। তার উদ্যোগে ও নির্দেশনায় সে সময়ে নানা রূপে প্রচলিত ধর্মসংগীত বিপুলভাবে সংগ্রহ করা হয় এবং গ্রেগরি স্বয়ং তাদের সুবিন্যস্ত করে সংগীতের একটি বিশেষ ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই গীতরীতি গ্রেগরিয়ান চন্ট নামে খ্যাত। গ্রেগরি বা সেইন্ট গ্রেগরি সুর ও তাল ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী সংস্কার করেছিলেন।

খ্রিষ্টীয় উপাসনা সংগীতের উদ্ভবকালে ছিল গ্রীক, হিব্রু ও সিরীয় সংগীত ঐতিহ্যসমূহ। পাশাপাশি স্বাধীনভাবে কিছু কিছু সুরও রচিত হয়েছে নব নব গীতে যোজনা করার জন্য। কিন্তু সাংগীতিকভাবে কোন কিছুই দানা বাঁধছিল না। একই উপাসনা সংগীতপ্রথা গড়ে উঠবার মত কোন সাংগীতিক ভিত্তি রচিত হচ্ছিল না। কিন্তু পূর্ববর্তী সাংগীতিক ঐতিহ্য ও নব নব চন্ট সমূহকে মিলিয়ে একটি সুসংহত সাংগীতিক রূপ দেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় সেই প্রথম যুগেই। সেই প্রয়োজনবোধের তাড়নায় কেউ কেউ এ কাজে উৎসাহ প্রকাশ করলেও পোপ গ্রেগরির(কার্যকাল ৫৯০-৬০৪) পূর্বে কেউই এমন কোন সাংগীতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, যার মাধ্যমে সেই সমন্বয় রূপলাভ করতে পারে।

পোপ গ্রেগরি উপাসনা সংগীতের প্রথম সুসংহত রূপ সৃষ্টিতে সমর্থ হন এবং তার নামানুসারে এই সংগীত প্রক্রিয়ার নাম হয় গ্রেগরিয়ান চন্ট বা গ্রেগরীয় স্তোত্রগীতি বা গ্রেগরিয় স্তবগান। গ্রেগরিয় চন্ট একরৈখিক সুরে গঠিত।এটি মনোফোনিক সংগীত, এর সংগে হার্মনি বা কাউন্টার পয়েন্ট তুল্য কোন কিছুর সম্পর্ক নেই। গ্রেগরিয় সুর রচনা পদ্ধতি খ্রিষ্টীয় ধর্মসংগীত রচনার আদি যুগে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে ও মানুষের অধ্যাত্ম সাধনার মর্মগুলোকে স্পর্শ করতে সমর্থ হয়। গ্রেগরিয় সুর রচনায় কোন নাটকীয়তাকে স্থান দিয়ে তথাকথিতভাবে চিত্তাকর্ষক করে তোলার চেষ্টা করা হয়নি।

এখানে রয়েছে সুরের শান্ত ও সমাহিত উত্থান পতন। প্রার্থনার অনুষঙ্গটি সুরে যেন ধ্বনিত হয়। এর মধ্যে কোন নিয়মিত ঝোঁক ব্যবস্থা নেই। এর ঝোঁক বা ছন্দাঘাত ব্যবস্থাকে মুক্ত বলা যেতে পারে। কয়েক প্রজন্মে গ্রেগরিয় ধারায় তিন সহস্রাধিক সুর রচিত হয় এবং ক্রমে তার একটি ঐতিহ্যসম্মত রূপ দাঁড়িয়ে যায়। প্রথম দিকে মৌখিকভাবে গীত ধারা এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। সুরের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকায় গায়কদের বিভিন্ন সুরের রূপরেখাটি স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় এবং তা থেকে নিউম উদ্ভাবিত হয়। গানের শব্দের ওপর প্রদত্ত সুরের আরোহ ও অবরোহ বুঝিয়ে এর গতিপ্রকৃতি জ্ঞাপক চিহ্নই হচ্ছে নিউম।

গানের কথার পরিপ্রেক্ষিতে সুর যোজনার তিনটি প্রধান শ্রেণী ছিল। যথা সিলেবিক, নিউমেটিক ও মেলিসমেটিক। সিলেবিক বলতে বোঝাত একটি সিলেবলের জন্য একটি নোট বা স্বরের ব্যবহার। নিউমেটিক বলতে বোঝাত একটি সিলেবলের জন্য নিউম দ্বারা চিহ্নিত দুই থেকে চার স্বরের ব্যবহার এবং মেলিসমেটিক শৈলী ছিল প্রাচ্য সুর রচনার ঢঙে প্রভাবিত। সে সময় প্রাচ্য সুর পাশ্চাত্য উপাসনা সংগীতে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল।

 

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *