কবিতার অবয়ব – অনিন্দ্য রায়

অনিন্দ্য রায়


প্রথম পর্ব

 

 

রেখা ও রঙে আঁকা ছবি আর অক্ষরের কবিতা ( অন্যান্য সাহিত্য আঙ্গিকও) – একই বোধিউৎসের দুই ভিন্ন প্রকাশ; শব্দ ও নৈঃশব্দ্য, আকার ও নিরাকার দিয়ে রচিত হয় এক বাস্তবতা যা পাঠক/দর্শকের চেতনাকে স্পর্শ করে, আরেক বাস্তবতাকে ট্রিগার করে। এই তো? আমরাই চিত্র এবং কাব্যকে আলাদা করেছি। ‘বর্ণ’, ধ্বনির লেখ্যরূপ, যা দিয়ে লেখা হয় আমাদের মননকথাগুলি, আর ‘বর্ণ’, রঙ, যা আমাদের চোখে এসে লাগে, মস্তিষ্কে তৈরি করে দৃশ্যগত অনুভব – আমরা ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করি। অথচ প্রতিটি বর্ণ/অক্ষরই তো একেকটি ছবি, রেখায় নির্মিত একেকটি সংকেত, আমরা ভুলে যাই অথবা ভুলি না। ছবি ও কবিতার এই অভিন্নতা ধরা দেয় কোনো কোনো শিল্পীর চোখে, কোনো কোনো কবির ভাবনায়। সেই ‘কেউ কেউ’ কবি ও শিল্প দুই মাধ্যমকে আর আলাদা করেন না, একই কমন ভাষ্যে প্রকাশ করেন। আমরা পাই ‘ছবির মতো দেখতে’ কবিতার নানান আঙ্গিক। সেপ পোয়েট্রি, কংক্রিট পোয়েট্রি, ভিস্যুয়াল পোয়েট্রি, ভিস্যুয়াল টেক্সট আর্ট, গ্র্যাফিকস পোয়েট্রি, এমব্লেমেটিক পোয়েম,ক্যামিগ্রাম, ক্যালিগ্রাফিক পোয়েট্রি, ভিসপো,টাইপোগ্রাফিক কবিতা, চিত্রকাব্য, ছক কবিতা,ছবিতা, অবয়ব কবিতা, কবিতারেখ, জ্যামিতিক কবিতা – এইসব নানান ফর্মের কথা আমরা শুনেছি বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কবিশিল্পীদের কাছে। এবং এই উপবিভাগগুলি গুণগত ও প্রকাশগতভাবে একে অন্যের থেকে আলাদা। সম্প্রতি বাংলাভাষায় অবয়ব কবিতা নিয়ে উৎসাহ নজরে পড়ছে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে শ্রুতি আন্দোলনে কবিতাকে প্রচলিত আকারের বাইরে অন্য আকারে লেখার উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। কিন্তু আলোচনার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি এই উপবিভাগগুলিকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ছবির মতো সাজানো’ যে কোনো কবিতাকেই হয় ‘অবয়ব কবিতা’ নয়তো ‘ ভিস্যুয়াল পোয়েট্রি’ এইরকম কোনো নামে ডাকছি। এই সাধারণীকরণে না থেকে আমরা চেষ্টা করি এই বিষয়টিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করার, উপবিভাগগুলির তুলনামূলক আলোচনা করার, বিশ্বসাহিত্যের পাশাপাশি আমাদের ভাষায় কাজগুলিকে ফিরে দেখার এবং নতুন সম্ভাবনাগুলিকে এক্সপ্লোর করার।

কবিতা, আমরা জানি, লেখার কিছু রীতি আছে।

সাধারণত অনুভূমিকভাবে একটা পৃষ্ঠার বাঁদিকের মার্জিন থেকে শুরু করে কবিতা লেখা হয়, কিন্তু তা ডানদিকের মার্জিন পর্যন্ত পুরো জায়গাটা ভর্তি করে না, একেকটি লাইন শেষ হয় ডানদিকের মার্জিনেই কিছুটা আগেই। কিছুটা  ফাঁকা থাকে ডানদিকে, আমরা জানি ।

একটা লাইনের দৈর্ঘ্য কত বড়ো হবে কবি তা ঠিক করেন কখনো ছন্দের প্রয়োজনে, কখনো অর্থের প্রয়োজনে, আবার কখনো তিনি এক নিশ্বাসে যতটুকু উচ্চারণ করতে পারেন একটা লাইন লেখেন ততটাই। একইভাবে  ছন্দ,অর্থের কথা মাথায় রেখেই তিনি স্ট্যাঞ্জা বিভাজন করেন। নির্মান করেন তাঁর কবিতাকে।

কখনো কবিতা লেখা হয় গদ্যের মতো, একটানা,ডানদিকের মার্জিন অব্দি, পুরোটা, কোনো স্পেস শূন্য থাকে না

লাইনটির শেষে ডানদিকে। পরের লাইন শুরু হয় বাঁমার্জিন থেকে, বা কখনো বাঁদিকে একটু ছেড়ে।

কবিতা, আমরা জানি, এভাবেই লেখা হয়, সাধারণত, এভাবেই ছাপা হয়।

পাঠক যখন পড়েন, পড়া শুরু করার ঠিক আগের মুহূর্তে তিনি দেখেন কবিতাটিকে। দেখেন, শব্দ-যতিচিহ্ন-স্পেস-লাইন-স্ট্যাঞ্জা এসবে নির্মিত এক গঠন, এক নির্মিতি, এর একটি দৃশ্যরূপ তাঁর চোখে পড়ে প্রথমেই। এই দেখটুকুই ফার্স্ট এনকাউন্টার, সেই কবিতার সাথে। তাঁর চেতনায়  কবিতার এই ভিস্যুয়াল রূপ, প্রথম দেখার এই ছাপ পড়ে অথবা পড়ে না। তারপর তিনি শব্দ-যতিচিহ্ন-স্পেস-লাইন-স্ট্যাঞ্জার এক দুনিয়ায় প্রবেশ করেন। শব্দার্থ থেকে আরো গভীরে ঢুকে যান তিনি, কবিতা পাঠকের বোধে ক্রমে ‘কবিতা’ হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রথম দেখার সেই স্মৃতি ভেতরে  ভেতরে কাজ  করে। অথবা করে না। ‘কবিতা’ তাঁকে ভুলিয়ে দেয়।

কবিতা, আমরা জানি, কবিতা লেখা ও ছাপার কিছু রীতি আছে।

এবং কখনো কখনো কবি তা মানেন না। লেখেন অন্যভাবে।

তিনি চান পড়ার আগে কবিতাকে প্রথম দেখেই পাঠকের চেতনা যেন আক্রান্ত হয়, কবিতায়। এবং অক্ষর-শব্দ-লাইন বিন্যাসে যে ছবি তৈরি হয়, তা সেই মুহূর্ত থেকেই পাঠককে কবিতায় প্রবেশ করাক, পুরো পাঠে এবং পাঠের পরেও ওই দৃশ্যময়তা তৈরি করুক কবিতার ব্যঞ্জনা পাঠকের চেতনায়।

তিনি অক্ষর, শব্দ, পঙ্‌ক্তি এমনভাবে লেখেন, এমনভাবে সাজান যে, একটা ছবি, একটা শেপ, একটা আকৃতি ফুটে   ওঠে। তা হয়ত কখনো এই কবিতার বিষয়, ভাবনাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ করে; কখনো করে না হয়ত।

শুদ্ধসত্ত্ব বসু ছবির মতো ক’রে সাজানো অক্ষরের কবিতাকে বলেছেন ‘ ছবিতা’। ছবি + কবিতা = ছবিতা । তাঁর ‘ বাংলা সাহিত্যের নানা রূপ’ বই-য়ে তিনি লিখেছেন, “ ছবি আর কবিতাকে একসঙ্গে বোঝাবার জন্য ছবিতা শব্দের সৃষ্টি। …কবি যখন তার কবিতার শব্দ তথা পঙ্‌ক্তিকে এমনভাবে সাজান – যাতে তাঁর গোটা কবিতাটি একটি দ্রব্যের আকার লাভ করে, তখন সেই চিত্রার্পিত কবিতাকেই ‘ ছবিতা’ বলা হয়। ছবিতা আসলে আকৃতি-কবিতা – যাকে ইংরেজিতে Shaped অথবা Emblematic poem বলে, অনেকে আবার আকৃতি-কবিতাকে ল্যাটিন কথা Cermen Figuratum অভিধায় চিহ্নিত করে থাকেন। …রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপি সংশোধনের চেহারা যারা দেখেছেন – তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে  রবীন্দ্রনাথ এমন সুনির্দিষ্ট ভঙ্গীতে তাঁর পাণ্ডুলিপি কাটাকুটি করতেন – যাতে ঐ স্পষ্ট কোনো একটি দ্রব্যের বা পশু-পাখির আকৃতি গ্রহণ করতো  ।… সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কয়েকটি আকৃতি-কবিতা বা ছবিতা রচনা করেছিলেন, … বিংশ শতাব্দীর প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে সাময়িক পত্র-পত্রিকায় মদের গেলাস, ডিকেন্টার,বৃক্ষ, ছাতা প্রভৃতি চিত্রাকৃতি কবিতা বের হতো ।”

শুদ্ধসত্ব বসুর লেখা একটি ছবিতা। শিরোনাম ঃ বিশিখ

 

ছবিতা একটি সাধারণ টার্ম । যেকোনো কবিতা যখন ‘একটি দ্রব্যের আকার লাভ করে’ তাকেই ছবিতা বলব । এখন কবিতার বিষয়/ভাবনা সেই ছবির বস্তুটির সাথে কতটা মিলবে তার ইঙ্গিত আছে শুদ্ধসত্ত্ব বসুর কবিতাটিতে। যদিও উদারহণ হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের যে কবিতার ( বরফির আকৃতিতে লেখা ‘ গ্রীষ্মের সুর’ ) কথা বলেছেন তার আকৃতি ও বিষয় ভিন্ন । ছবিতা শব্দটির মাধুর্য আমাদের যতটা মুগ্ধ করেছে যতটা তার গুণাবলি চিহ্নিত করতে আমরা তত উৎসাহী হইনি। তবু, ছবির মতো ক’রে সাজানো অক্ষরের কবিতাকে সাধারণভাবে আমরা ‘ছবিতা’ বলতে পারি যেখানে কোনো বস্তুর স্পষ্ট আকৃতি ফুটে উঠবে । এই কবিতায় ভাষাগত উপাদান ( লেক্সিক্যাল এলিমেন্ট ) বাদ দিয়ে কোনো চিত্রগত উপাদান ( ড্রয়িং এলিমেন্ট ) থাকে না।

শেপ কবিতা, অবয়ব কবিতার সাথে এর মিল এবং গ্র্যাফিক্স কবিতা, কবিতারেখ, ভিস্যুয়েল পোয়েট্রি,  জ্যামিতিক কবিতা,কনক্রিট পোয়েট্রির সাথে এর ভিন্নতা লক্ষ্যনীয় ।

( ক্রমশ )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *