সাইরেন

রুমেলা দাস


জেব্রা ক্রসিং এর সাদা ডোরাগুলো দ্রুত পেরিয়ে স্পর্শ যখন কলেজের সামনের লনটায় এসে পৌঁছলো, তখন কাউন্টারে রেশন দোকানের মতো ভীড়।গোটা পঁচিশেক কালো মাথা কিচির মিচির করছে।ডায়ে-বাঁয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সিনিয়র জুনিয়রদের জটলা।

আজ পার্ট-টু ফী জমা দেওয়ার শেষ দিন।সুবিধামতো জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতেই-

‘কি রে এত লেট করলি কেন?চাপ খেয়ে গেছিলাম!এদিকে তোর ফোনটাও………ভুট্টোর কথায় ফুলস্টপ পড়ার আগেই উপরের ঝুল বারান্দা থেকে হিসহিস,ফিসফিস,মুখ চাপা অস্পষ্ট হাসি কানে এলো।

কাউন্টার থেকে কলেজের এই বারান্দাটার অবস্থান কোনাকুনি।অনেকটা জ্যামিতিক নাইন্টি-সিক্সটি আকৃতির মতোই।তাই উপর,নিচে চোখাচুখি কথাকোথি বেশ সহজ।ঘটনার ঘনঘটা অনেকটা ফিল্মি পর্দার মতো।কিন্তু স্পর্শ কোনোদিনই কোনোভাবেই নিজেকে মেলে ধরতে চায়নি,চায়ও না।সে পড়াশুনা হোক কি অন্য কিছু।তেরছাভাবে সামান্য দেখেই চোখ নামিয়ে নেয় ও।হালকা গোলাপি রঙের চুড়িদার কামিজ আর তাকে ঘিরে লাল,হলুদ,বেগুনির মেলা।এই সময়টায় মনে হয় কে যেন মাটি ভর্তি আস্ত একটা ফুলগাছের টব সজোরে ওর বুকের উপর চাপিয়ে দেয়।পা দুটো আড়াল খুঁজতে চায়।মনের ঢাকনাটাকে আঁটোসাঁটো করতে করতে নিজেকে বলে-স্পর্শ,তুমি উড়তে পারবেনা।কেউ যেন রং-পেন্সিল হাতে ছাই রঙের প্যাস্টেল শেড করে দিতে দেয় ওর সমস্ত রঙিন খাতা জুড়ে।তেতো হয়ে ওঠে মনটা।কিন্তু ও জানে, ওর মন জানে বেমানান এই বারান্দাটা বড্ড মানানসই।গোটা কলেজের থেকে এটা একদম অন্যরকম।সামান্য ঝুঁকে পড়ার কায়দায় নতজানু হয়ে আছে।

‘ধ্যান করছিস নাকি?চলে গেল তো!’—আচমকা ঝাঁকুনিতে সম্বিৎ ফিরলো স্পর্শের।

‘কেসটা কি বলতো?!ওকে দেখলেই তুই নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মত রিঅ্যাক্ট করিস কেন বুঝিনা!’ মিরাক্কেল হাসি দিয়ে ভুরু নাচালো ভুট্টো।

কেসটা জন্ডিস না টাইফয়েড তার সমাধান করা স্বয়ং বরাহমিহীরের অসাধ্য।ওকে দেখামাত্রই স্পর্শ নিজের মাঝামাঝি হাইট-এর শরীরটাকে ভিড়ে বেশ যত্ন করে আড়াল করে।ছোটবেলা থেকে নিজেকে আড়াল করতে একেবারে সিদ্ধহস্ত ও।সবার মাঝে থেকেও কিভাবে নিজের মনকে সবকিছু থেকে দূরে রাখা যায় জানে ভালোরকম।ওর মনে কি ঘটছে,কি ঘটতে চলেছে তা ওই জানে।

তাই ভুট্টোর কাছে নিজের কেস ফাইল বন্ধ করে বলে-‘আরে তেমন কিছুই নয়,সামলে চলি ভাই।’

ভুট্টো,ভালো নাম সৌহার্দ্য।মাসি,কাকী,নতুন কাকী,পাড়াতুতো দিদি,কমপ্লেক্স দিদি এদের দিকে সৌহার্দ্যের হাত যেভাবে বাড়ায় তাতে আর কিছু না হোক,এ নাম স্বার্থক।

স্পর্শের সাথে ওর মেশামিশি আছে তবে মাখামাখি নেই।মা-র এই কথা কানে বাজে সবসময় “মিশিও তবে মাখামাখি কোরোনা।”ভুট্টো  আর ওর তফাৎ অনেকটা।খাওয়া দাওয়া,ওঠাবসা এমনকি পরিবার জীবনও ভিন্ন।ব্যবসাদার বাবা,মা-র একমাত্র সন্তান ভুট্টো।আগামী ভাবায় না।তাই কেস খাওয়া,কেস খাওয়ানো অনেকটাই সহজ ভুট্টোর কাছে।একই পাড়া, স্কুল,টিউশন,তারপর কলেজ ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব এনেছে।

‘চল,হাঁটা লাগাই,আমার আবার জিমে যেতে হবে।আজ বাইকটা সার্ভিসিংয়ে দিয়েছি।’-কাউন্টারের কাজ মিটিয়ে স্পর্শের কাঁধে হাত রেখে ভুট্টো ওরাংওটাং-এর মতো পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলো।ইদানিং ভারী ওজোন তুলে তুলে ও বেশ খানিকটা ভারী হয়েছে।পাশে কেউ থাকলে তার ঘাড়ে নিজের ওজনের চল্লিশ-শতাংশ চাপিয়ে দেয়।

পিছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে শর্মার দোকান ছাড়িয়ে ওরা ফায়ার ব্রিগেডের দিকে হাঁটা লাগালো।এখনো তিনটে বাজেনি।তাই বাস ব্রিগেডের সামনে দিয়েই যাবে।

 

 

(পরেরদিন)

 

বাস মানে মিনিবাস।

কলেজে আসার সময় বাসস্ট্যান্ডের হাত চারেক দূর থেকেই স্পর্শ দেখে কেবিনে বসে রবিন পাখির মতো খুব চঞ্চল,অস্থির ভাবে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে মেয়েটা।সবসময় কি যেন এক অস্থিরতা ওর মধ্যে।মনে হয়,হটাৎ কোনো স্পেসশিপ  ওকে ধরাধামে দিয়ে গেছে।সাধারণের চেয়ে দ্রুততা তাই বেশ বেশি।

বিপদ ঘন্টি বেজে উঠেছিল স্পর্শের মনে।রেলিং দিয়ে ঘেরা গাছগুলো রং হারিয়ে তামাটে হয়ে গেছে।সরকারি,বেসরকারি দুটো গুমটির মাঝামাঝি বসে পাগলি বুড়ি রোজের মত আজও একমাথা ভর্তি সিঁদুর মেখে ফেলে ছড়িয়ে মুড়ি খাচ্ছে।

উপায় নেই।ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছাড়িয়েছে।এক পা দু পা করে সিঁড়ি বেয়ে বাসের উপরে উঠলো স্পর্শ।কপালের ঘাম মুছে রুমালটা পকেটে পুরতে যাবে কি-“দ্যাখ,আমি চুল কেটেছি।”

একেবারে সুপার হিরো চরিত্রগুলোর মতো হাওয়ার বেগে এসে বসেছে অনেকটা কাছে,স্পর্শের গা ঘেঁষে।

আগুনের গোলার মতো মার্চ মাসের কড়কড়ে রোদ গোটা শহরটাকে যেন পাঁপড় ভাজা করে দিচ্ছে।কিন্তু স্পর্শের সমস্ত শরীর জুড়ে দমকা এক ঠান্ডা জলো হাওয়া বয়ে চলেছে।রেলিং-এর ওপারে যেখানে টাক্সিগুলো দাঁড়ায় ,দুটো পায়রা খুব কাছাকাছি।সামনের ধুলো পড়া না জানি কবেকার হোডিং এ চোখ চলে যায় ওর,লেখা-‘বসন্ত এসে গেছে’।

 

 

 

ইলাসট্রেশন ঃ ফারজানা মণি 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *