ফেমিনাইন ভ্যানিটি আর একটা বিশুদ্ধ সিনেমা

সৌম্যদীপ দাস


সিনেমার রিভিউ লেখার জন্য আমার হাতের কাছে অজস্র রেফারেন্স ছিল। কিন্তু সেই সমস্ত রেফারেন্স গুলোকে রীতিমতো নাকোচ করেই আজ একটা আনকোরা সিনেমা নিয়ে লিখতে বসেছি। প্রভাবশালী এবং প্রতিষ্ঠিত নির্মাতাদের সিনেমাকে নিয়ে লেখার জন্য বড় থেকে ছোটো অনেক পত্রিকাই বাজারে রয়েছে। তবে কোনো পত্রিকা কে এখনো তথাকথিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম মেকারদের সিনেমা নিয়ে লিখতে দেখিনি। কেউ পকেট মানি জমিয়ে সিনেমা বানাচ্ছে, কেউ টিউশনির টাকা বাঁচিয়ে আবার কেউ কেউ বন্ধুদের থেকে চাঁদা তুলে। এদের হাতে দামি ব্র্যান্ডের মুভি ক্যামেরা নেই, প্রফেশনাল এক্টর নেই প্রপার ইকুইপমেন্টস নেই পর্যাপ্ত আলো নেই।যেটুকু আছে সেটা প্রচার না পাওয়ার অন্ধকার। তাই আজ সিনেমার রাজপথ থেকে সরে এলাম মেঠো পথে। যেখানে ঘাস বন আছে পাথুরে প্রলাপ আছে আর আছে এক নিরন্তর সততা।

এখন ইউটিউব খুললেই আমাদের অজস্র আনকোরা নাম, আনকোরা চলচ্চিত্র হাতছানি দেয় ঠিকই তবে কখনও তা  আনকোরা বলেই এড়িয়ে যাই আবার কখনো ডাটা লসের অজুহাতে চোখ বন্ধ করে নিই।
চোখ বন্ধ করে নিতে নিতেই আমরা কখন যে অন্ধই হয়ে যাই তা বোধহয় খেয়ালও করিনা।
যাইহোক আজ যে ছবিটাকে  নিয়ে কাটা ছেঁড়া করতে বসেছি সেই ছবির সবথেকে বড় ইউ.এস.পি ছবিটি আদ্যপ্রান্ত একটি চলচ্চিত্র, একটি সিনেমা।
গল্প উপন্যাস কবিতা কিংবা প্রবন্ধ সবাই নিজের জায়গায় স্বতন্ত্র আবার কখনো একে ওপরের মিথস্ক্রিয়ায় হয়ে ওঠে অনবদ্য কোনো শিল্প বা সাহিত্য।’অনুস্মরণ’ সিনেমাটিও(শর্ট ফিল্ম দৈর্ঘের বিচারে,যদিও শর্টফিল্ম শব্দটিতে আমি বিশ্বাস করিনা) নিজেস্ব গুণে আর পাঁচটা সিনেমার থেকে একদম আলাদা। কেউ যখন আমায় প্রশ্ন করে ‘অমুক সিনেমাটার গল্পটা যেন কী?’ আমার বড্ড রাগ হয়। কারণ আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় সিনেমায় গল্প থাকাটা একেবারেই কো ইনসিডেন্স। কিন্তু সিনেমার মধ্যে সিনেমা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। কিংবা কয়েকটা সিনেমাটিক মোমেন্টস অথবা একটা প্লট।

অনুস্মরণ দেখতে গিয়ে সবার প্রথম যে শব্দটা আমার অনুভূতির দরজায় কড়া নেড়েছে সেটা খুব সাধারণ একটা শব্দ।”সম্পর্ক”। কিন্তু এই সাধারণ শব্দটির বহুমাত্রিক ব্যাপ্তি যে কত ভাবে দেখানো সম্ভব তার একটা আদর্শ উদাহরণ অনুস্মরণ। তবে শুধুমাত্র এই একটা শব্দ দিয়ে গল্প, উপন্যাস কিংবা সিনেমা এর আগেও হয়েছে এবং অতীতকে অনুস্মরণ করে পরেও হবে। অন্তত এই একটি ব্যাপারে মনে হতে পারে  “অনুস্মরণ” প্রাপ্তির খাতায় আরো একটি প্রাচীন হিসেব। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার মানুষ পুরোনো হিসেবেই সবচেয়ে বেশি ভুল করে বসে। সন্ধ্যের মায়াবী আলোয় নিজের ছায়া খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় আমাদের মনে হয়, আমরা বোধহয় এতকাল কেবল হিসেব কষতেই শিখেছি অথচ হিসেব মেলাতে শিখিনি।

অর্ক আর পাঁচটা ভেতো বাঙালির মতোই একজন স্বামী।কখনো কবি, গল্পকার সিনেমা করিয়ে বা ঔপন্যাসিক। কিন্তু সর্বোপরি সে একজন প্রেমিক। একজন পুরুষের সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক কী?-বৈবাহিক, শারীরিক, হার্দিক নাকি সবকটাই? অর্ক এই সমস্ত বহুমাত্রিক প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজে বেড়িয়েছে সারাক্ষন। অন্যদিকে অর্কর স্ত্রীর দুটি সত্তা। কোথাও সে একজন সংসারী স্ত্রী আবার কোথাও সে একজন নারী। সে রান্নাঘর,বারান্দা,ব্যালকনি সামলে উঠে ব্যক্তিগত জীবনে কোথাও না কোথাও জড়িয়ে রাখে তাঁর নারীত্বের চাদর, জড়িয়ে রাখে তার মেয়েলি অহংকার। বৈবাহিক জীবনে পার্থিব চাহিদার আড়ালে প্রত্যেক নারী যে সত্তাকে সযত্নে মুড়ে রাখে ফেমিনাইন ভ্যানিটির মধ্যে তা একটু একটু করে খুঁড়ে দেখেছে অর্ক।
সিনেমা জুড়ে অর্ক যেন নির্বোধ। আবার অর্কই যেন তার স্ত্রীর প্রত্যেকটা বোধের আধার। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী   একাধারে একজন বাঙালি বউ আর অন্যদিকে একজন নারী।
যদিও আগেই বলেছি সিনেমার কোনো গল্প হয়না। সিনেমা ইজ সিনেমা। তবুও লেখক হিসেবে যদি সিনেমাকে ন্যারেট করতে হয় তবে আমার অপরাধের কোটায় পড়ে থাকে এটুকুই। কিন্তু গল্প থেকে যদি আমি সিনেমার ক্যানভাসে ধরার চেষ্টা করি অনুস্মরণকে তবে তা নিতান্তই বোকামি। ‘অনুস্মরণ’কে শব্দ ব্যাপ্ত করতে পারেনা বরং অনুস্মরণই অনুস্মরণের স্বতন্ত্রতা বিশ্লেষণ করে।
যাইহোক এবার আসা যাক চলচ্চিত্রটির বাকি দিক গুলোয়।
প্রথমেই যার প্রশংসা করতে হয় তিনি সায়ন্তন বোস। চলচ্চিত্রটির স্ক্রিপ্ট রাইটার ডিরেক্টর এবং অর্ক চরিত্রটির অভিনেতা। নিজে ডিরেক্ট করে নিজেই অভিনয় করার মধ্যে যে এক বিশাল আশঙ্কার সম্ভাবনা রয়েই যায় তা তিনি খুব সযত্নে হ্যান্ডেল করেছেন।
দ্বিতীয়ত, গল্পের গতির সাথে ক্যামেরার গতির নিয়ন্ত্রণ।ছবিটি দেখার সময় আমাকে সর্বপ্রথম আকৃষ্ট করে এই সিংক্রোনাইজিং প্রসেসটিই। সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য এর ক্যামেরা দক্ষতা সত্যিই মুগ্ধ করে। গল্প যেভাবে মুভ করেছে সিদ্ধার্থের ক্যামেরাও যথাযথ সঙ্গ দিয়েছে। কোনো নতুন তথাকথিত আনকোরা চলচ্চিত্র করিয়েদের মধ্যে এত ভালো সিঙ্ক আমি এর আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়েনা(বড় প্রোডাকশন ছাড়া)।
এছাড়াও খুব কম রিসোর্সেস ব্যবহার করে দামি ক্যামেরা ছাড়াই ডিম লাইট শ্যুট সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। ছবিতে আলোর ব্যবহার কলাকুশলীদের  বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। এছাড়াও অর্কর স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করা দুজন অভিনেত্রী অনবদ্য। তবে কয়েক জায়গায় আরো ভালো হওয়ার সম্ভবনা ছিল। অর্ককে একজন বাঙালি স্বামী হিসেবে একটু আন্ডার এজেড মনে হলেও তিনি অভিনয় দিয়ে অভাব পূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন।
এছাড়া আরো কয়েকটি সেকশন সম্পর্কে না বললে অবিচার হয় তা হল রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার। কোনো সো কল্ড লো বাজেট ফিল্মমেকার দের এত সুন্দর করে রবীন্দ্রনাথের গান এবং রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করতে সাম্প্রতিক কাউকে দেখিনি।
অর্ক এবং তার স্ত্রী যখন তাদের বিয়ের প্রথম রাতে ফিরে যায় সেই দৃশ্যে অন্য এক অভিনেত্রীর ব্যবহার যেমন সিনেমাকে কাব্যিক করেছে তেমনই জঙ্গলের মধ্যে সেই দৃশ্যের আয়োজন চলচ্চিত্রটির সিনেমাটিক ভ্যালু বাড়িয়েছে।
এছাড়াও প্রথম রাতের পর স্ত্রী কে গঙ্গায় সমর্পন করা এবং ঠিক তার পরের দৃশ্যে ঘরের মেঝেতে জলের ব্যবহার, এই আইডিয়াটিও অনবদ্য।
তবে বিসর্জনের দৃশ্যটি যে ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে তা এস্টাব্লিশিং শটে ব্যবহার করলে হয়তো গল্পটির সময়কে আগেই সুন্দর ভাবে প্রেজেন্ট করার স্কোপ থাকতো।
রেটিংয়ে বিশ্বাস করিনা তবে সমস্ত পজেটিভ ব্যাপারে মধ্যে ছবির সাউন্ড(ডায়লগ রেকর্ডিং) কিছুটা হলেও হতাশা জনক।
যদিও এত কম রিসোর্সেস ব্যবহার করে(কেবলমাত্র ডি.এস.এল.আর এর কিট লেন্স, অডিও রেকর্ডার ছাড়া অন ক্যামেরা সাউন্ড রেকর্ড) এত ভালোবেসে যত্ন নিয়ে বানানো ছবিটি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। ছবিটি ‘চলচ্চিত্র ২০১৭’ফেস্টিভ্যালের উইনার, এবং ‘লস এঞ্জেলেস সিনে ফেস্ট’ প্রতিযোগিতার ফসিনালিস্ট এবং এছাড়াও আরো কয়েকটি ফেস্টিভ্যালে অফিশিয়ালি সিলেক্টেড।
সুতরাং ডেটা লসের ভয় কে দূরে রেখে আপনার স্মার্টফোনে কিংবা ল্যাপটপে পঁয়ত্রিশ মিনিট হাতে নিয়ে বসে পড়তেই পারেন অনুস্মরণ দেখতে। পোস্টমর্ডানিজমের দিব্যি ঠকবেন না।

(সিনেমাটি দেখতে ইউটিউবে সার্চ করুন anuswaran, সিনেমাটির প্রোডাকশন হাউসের নাম elegant drop)
(লিংক দিতেই পারতাম কিন্তু আমি সিনেমাটির সমালোচক প্রচারক নই। তাই পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকলাম।)

2 Comments

  • Erkm obastob akta review publish koranor jnno koto taka lage ektu bolte paren??

    • আপনি যে বাস্তব অবাস্তব কিংবা অতিবাস্তব নিয়ে এতখানি সচেতন তা জেনে বেশ ভালো লাগলো। আর টাকার প্রসঙ্গে বলি আমার বাগানে একটা টাকার গাছ আছে ওই গাছে একবার নাড়া দেয়ার পর যত গুলি নতুন দু হাজারের নোট মাটিতে পড়েছিল ঠিক তত টাকা দিয়ে আমি রিভিউটি ছাপিয়েছি। আপনি আগ্রহী হলে জানাবেন আপনাকেও একটা টাকার গাছ উপহার দেব। না না পয়সা লাগবে না। মানসিক অবসাদগ্রস্থ দীন-দরিদ্র মনোভাবসম্পন্ন মানুষদের প্রতি আমার অসীম করুণা। ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন। আপনার সুস্থতা কামনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *