ডিলানে গিটার: সাহিত্যে বা গানে

অবর্তু


রাজীব গান্ধীর বিকল্প খুঁজতে গিয়ে যখন প্রতিযোগীদের পিছনে ফেলে বাজীর ঘোড়া হয়েছিলেন জ্যোতি বসু (অবশ্য পরে হননি অন্তর্কলহে) তেমনি নোবেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বনামধন্য সাহিত্যিকদের পিছনে ফেলে বাজী জিতলেন রবার্ট আলেন জিমারম্যান। সাহিত্যে নোবেল পেলেন একশতেরো তম। জিমারম্যান বিশুদ্ধ সাহিত্যকার নন, অর্থাৎ তথাকথিত কবি নন, উপন্যাসিক নন, প্রবন্ধকার নন। নাটককার নন। তিনি গীতিকার- লিরিক লেখেন তারপর সুরে ও কন্ঠে করে তোলেন জীবন্ত ও চলমান। তার রচনা সাহিত্যের প্রধান শাখাগুলির মত গম্ভীর ও গাম্ভীর্যবান নয়। নয় চেতনাপ্রবাহী ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার তীব্র অন্তর্জাল। তাহলে সাহিত্যের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় জিমারম্যান কিভাবে পেয়ে যান সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরষ্কারটি? প্রশ্ন উঠেছে সারা বিশ্বজুড়ে।

জন্ম 1941 সালের 24 শে মে। বারো বছর বয়সেই হাতে তুলে নেন গীটার। ক্রমে আকৃষ্ট হন ফোক সঙ্গীতে। 1959 সালেই প্রথম মিনেসোটার কফিহাউসে কফিহাউসে গান গাওয়া এবং নাম বদলে নেন ইংরেজ কবি টমাস ডিলানের আদলে। হয়ে উঠলেন আজকের কিংবদন্তি বব ডিলান। সদ্য নোবেল পেয়েছেন বলে তিনি সদ্য আলোচিত নন। তার পরিচিতি বহুদিনের, বিশ্বজুড়ে। তার গানে, সুরে, কথায় এক অনবদ্য মায়াজাল ছড়িয়ে দিয়েছেন বহুকাল। নোবেল তার কাছে নস্যি।

বাঙালির সঙ্গে বব ডিলানের পরিচয় দীর্ঘ দিনের। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের (1971) সময় নিউইয়র্কে পন্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে বাংলাদেশের সমর্থনে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ থেকে। তারপর অঞ্জন দত্ত কবীর সুমন ববকে করে তুললেন বাঙালির ঘরের মানুষ। অঞ্জন গাইলেন “জন লেলনের ভালোবাসা বব ডিলানের সোচ্চার অভিমান” কবীর সুমনের “কতটা পথ পেরোলে পথিক বলা যায়” গাইতে গাইতে উৎসে ফিরে গেছি” হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন” । বব ডিলানের প্রভাব এরকম অজস্র প্রভাব বিশ্বের আনাচে কানাচে। এক ভিন্ন জীবন দর্শন কথায় ও সুরের মেলবন্ধনে রূপায়িত হয় প্রতিমা ও প্রাণে।

ডিলানের গদ্য এবং পদ্যের সংমিশ্রণে প্রথম বই প্রকাশিত হয় 1971 সালে। “টরান্টুলা”। 1973 সালে “রাইটিংস এন্ড ড্রয়িংস” 2004 সালে তার বর্ণময় জীবনের স্মৃতিকথা “ক্রনিকলস” তার রচিত পাঁচটি বইয়ের মধ্যে এই তিনটিই সবচেয়ে আলোচিত। কিন্তু ববের পরিচিতি তো শুধুমাত্র সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। তার আসল ব্যাপ্তি এবং বিকাশ তার লিরিকসে এবং সুরে। তার অপূর্ব মূর্ছনাগুলো ধরা আছে ‘ব্রিংগিং ইট অল ব্যাক হোম ‘ এবং হাইওয়ে 61 রিভিসিটেড’ (1965), ‘ব্লন্ড অন ব্লন্ড’ (1966), ‘ ব্লাড অন দ্য ট্রাকস’ (1975), ‘ ওহ মার্সি’ (1989), ‘টাইম আউট অফ মাইন্ড ‘ (1997), ‘ লাভ দ্য থিপ্ট’ (2001) ‘মডার্ন টাইমস’.২০০৪ এবং সর্বশেষ এলবাম “ক্রিসমাস ইন দ্য হর্ণ” (2009)। এই অ্যালবামগুলোকে সুইডিশ একাডেমি এভাবেই দেখেছেন- ‘ আ ট্রিমেন্ডস ইমপ্যাক্ট অন পপুলার মিউজিক’।

2016 সালের 13ই অক্টোবর ডিলানকে নোবেল প্রাপক ঘোষনা করে সুইশ আকাদেমির পক্ষে সারা দানিয়ুস বলেছেন -” আমেরিকার সঙ্গীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক মূর্ছনা সৃষ্টির জন্য” তার এই প্রাপ্তি। এবং সেই সঙ্গে তিনি গ্রীক কবি হোমার এবং লেসবিয়ান কবি শ্যাফোর সঙ্গে তুলনা করেছেন ডিলানকে। আকাদেমির আর এক সদস্য ওয়েস্টবার্গ বলেছেন “সম্ভবত তিনি জীবিত মহান কবি”

আর এরপরই সমস্ত বিশ্বসাহিত্য মহলে বয়ে গেছে তুমুল তর্ক বিতর্কের ঝড়। যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাব্য নোবেল প্রাপকদের তালিকায় আছেন জাপানি সাহিত্যিক হারুকি মুকারামি বা স্প্যানিশ কুন্ডেরা অথবা কেনিয় নাগুগি। তাহলে কোন সাহিত্যদর্শনের ভিত্তিতে নোবেল ছিনিয়ে নেয় ডিলান? গতবারো অপ্রত্যাশিত ভাবে পেয়েছিলেন মূখ্যত সাংবাদিক উপন্যাসিক সুইডেনের স্ভেতলানা
আলেক্সিয়েভিচ। এবারেও প্রথাবিরোধী নির্বাচন!!! তাহলে কি নোবেল প্রাপ্তির যোগ্যতা সম্পন্ন সিরিয়াস কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ নেই বিশ্বসাহিত্যে? এ প্রশ্ন উঠে যায়। এপ্রসঙ্গে বলে রাখা উচিত নোবেল কিন্তু সাহিত্যের সর্বোচ্চ মানদণ্ড নয়। একটা পুরষ্কার মাত্র।

তবুও পুরষ্কার প্রাপ্তির খবর পেয়ে সলমন রুশদি দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখেন- ”
উই লিভ ইন আ টাইম অফ গ্রেট লিরিকিস্ট- সংরাইটার্স লিওনার্দো কোহেন, পৌল সিমন, জনি মিচেল, টম ওয়াটস বাট ডিলান টুওয়ারস ওভার এভরি ওয়ান। হিজ ওয়ার্ডস হ্যা বিন এন ইন্সপিরিয়েশন টু মি অল মাই লাইফ এভার সিন্স আই ফার্স্ট হেয়ার্ড আ ডিলান এলবাম এট ইস্কুল এন্ড আই য়্যাম ডিলাটেড বাই হিজ নোবেল উইন। দ্যা ফ্রন্টিয়ারস অফ লিটারেচার কিপ ইউডনিং, এন্ড ইটস এক্সাইটিং দ্যাট দ্যাট নোবেল প্রাইজ রিকগনাইজস দ্যাট।” লেখক স্কলজি ববের সমর্থনে এগিয়ে এসে বলেছেন- ‘গানের লেখাও একধরনের লেখা এবং গত একশো বছরের সেরা লেখক বব ডিলান’ অধ্যাপক ক্রিস্টোপার রিক্স বব ডিলানের গানের কথাকে তিনি টি এস এলিয়ট এবং লর্ড টেনিসনের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। নারীবাদী লেখক জয়েস ক্যারলও হাত ধরেছেন- ‘গভীরভাবে দেখলে তার যাদুময়ী সংগীত এবং গানের কথা সবসময়ই সাহিত্য’। কিন্তু সর্বত্র ডিলানের জনসমর্থন মেলে নি। বাংলাদেশের একজন জনৈক সাহিত্যিক ব্যাজস্তুতি করে বলেছেন -‘ডিলানের সব কবিতাই আমার মুখস্থ সব উপন্যাস আমার পড়া আর সব প্রবন্ধই কি গভীর আর মননশীল’ এই উক্তির পিছনে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই আবার অনেকেই স্ব স্ব যুক্তি নিয়ে সুইডিশ কমিটির উপর খড়গহস্ত।

মশকরা করে বলা হচ্ছে পরপার থেকেই দারিয়ো ফো যেন এই কৌতুকটা ছুঁড়ে মারছেন পৃথিবীতে। দারিয়ো ফো’র যেদিন মৃত্যু সংবাদ ছাপল কাগজ সেইদিনই ডিলানের নোবেল প্রাপ্তির সংবাদও ছেপেছিল। উল্লেখ্য দারিয়ো ফো ই একমাত্র নোবেলজয়ী সাহিত্যিক যার লেখালেখির বিষয়ে কোন উৎসাহ ছিল না বব ডিলানে যেন ফিরে এলেন দারিয়ো ফো। বলা হচ্ছে, লিখিত ভাষাকে সুরক্ষার যে মহান ব্রত ও ঐতিহ্য সুইডিশ একাডেমির ছিল, বব ডিলানকে নোবেল দিয়ে তার বারোটা বাজানো হল!

দারিয়ো ফো কে এইজন্য জাগানো হলো, তিনি ইতালিয়ান নাটককার। তিনি নাটক লিখেছেন মঞ্চে অভিনয় করার জন্য। নিজে অভিনয় করে গেছেন পাতার পর পাতা না লিখে। আউড়ে গেছেন স্ক্রিপ্ট। একজন নাটককার কিভাবে নোবেল পায়? এযাবৎকাল 18 জন নাটককার নোবেল পেয়েছেন তাদের লেখা পাঠাবস্থায় আহামরি কিছু নয়, কিন্তু মঞ্চে লাইটে নবনির্মাণ করেছে অপলক মুগ্ধতা আর আবেদন। ডিলানের গান কি সে রকম জীবন্ত হয়ে ওঠেনি?

আমরা পাঁচ হাজার বছর পিছনে ফিরে গেলে দেখতে পাব। হোমের রচিত ‘ইলিয়ড’ ‘ওডিসি লেসবিয়ান কবি শ্যাফোর কালত্তীর্ণ রচনা তো গীতিকবিতাই। তা তো গান হিসেবে গাওয়ার জন্যই রচিত। এবং তখনতো গুটেনবার্গ যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন নি । সঙ্গতভাবেই বেশিমানুষের মাঝে ছড়িয়ে যেতে নাটক সঙ্গীত আবৃত্তি অবিকল্প মাধ্যম। রামায়ণ মহাভারত কালিদাসের রচনা তো মানুষকে শোনানোর জন্যই রচিত। লিখিত লিপির কতইবা বয়স!!! সুপ্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই তো মানুষ আপন মনে গুনগুন করে উঠেছে, প্রতিবাদ প্রতিরোধ ভালোবাসা মান অভিমান। যে আদিম মানুষ প্রথম চিৎকার করে উঠেছিলেন। সেই ধ্বনিই কি সাহিত্যের আদ্যক্খর নয়?? সাহিত্য কি সবসময়ই গ্রামারভিত্তিক লিপিবদ্ধ লিপি?? সারা দানিয়ুস তাই বিতর্কের অবসানঘটাতে ডিলানের গান উল্লেখ করেছেন- ‘পারহাপস দেয়ার আর টাইম চেঞ্জিং’

পরিচিত বাংলা সাহিত্যে আঙিনায় ফিরে আসি। প্রাচীন কাব্য চর্যাপদ তো গীতিকাবিতা। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন সে ও তো কীর্তন করে গাওয়ার জন্যই রচিত। মধ্যযুগের অসামান্য সৃষ্টি বৈষ্ণবকবিতা তো আদতে সঙ্গীতই। যার আবেদন চরম আধুনিকতায়ও ম্লান হয়নি। মঙ্গলকাব্য সেও তো গীতি। এগুলো কি সাহিত্য নয়??? ঞ্জানদাস, গোবিন্দদাস, চন্ডীদাস বিদ্যাপতির পদ কি শুধুই সঙ্গীত?? সাহিত্যিক গুরুত্ব নেই বা সাহিত্যিক অমরতা লাভ করেনি? রামপ্রসাদের শাক্তগীতি বা নিরক্ষর লালন তো একটা অক্ষরও আচড় কাটেনি। মুখে মুখে বেঁধেছেন আর শিষ্যরা ধরে রেখেছেন অসামান্য দক্ষতায়। লালনের সেই গান কি কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠেনি? সেই কথায় সুরে ভিন্ন জীবন দর্শনের কথা বলেনি? আমরা গান শোনার পাশাপাশি তা সাহিত্য হিসেবেও পড়ি। কৈ সেখানেতো সাহিত্যিক উপাদানের খামতি নেই। নাক উঁচুরা কি বলবেন- লালন গীতিকার মাত্র। আর গানগুলি লিরিকস বই কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ তো ঠাকুরই। এক কিংবদন্তি নাম। তার পিছনে কি সঙ্গীতের ভূমিকা নেই। ‘গীতবিতান’ পবিত্র রামায়ণ মহাভারত বেদ কোরান বাইবেল। যা ছুলেই প্রশান্তি আসে ঝঞ্ঝাবিক্খুদ্ধ জীবনে। সে তো পরম আশ্রয়। কথায় সুর বসিয়ে মানুষের অন্তরতম সত্ত্বার কাছে পৌছে যায়। সেগুলো কি সাহিত্যে উত্তীর্ণ হতে পারেনি না কম পড়েছে দু চারটে গ্রামারটিক্যালি শ্যাওলা ধরা প্রাচীন পাথররের। ‘গীতাঞ্জলি’ তো গানই । কিন্তু সেখানে কবিতা হিসেবেও অনবদ্য। তার অবস্থান অনেক উচ্চমার্গ অবস্থিত।

সেভাবেই দেখতে গেলে ডিলানে সমস্ত গানের কথা ডিলানের লেখা। গানের কথা কি সাহিত্যের অংশ নয়? ডিলানের গানে যার্বো থেকে বোদলেয়ার ওয়াল্টার হুইটম্যান থেকে আলেন গিন্সবার্গের স্পর্শ। তার গানগুলি দ্রোহ ও স্বাধীনতার ভার বহন করে। এই গানগুলি যুদ্ধবিরোধী ও নাগরিক আন্দোলনের অনেক সংগঠন। মর্ম সঙ্গীত হিসেবে ব্যাবহার করে। ‘ব্লোইন ইন দ্য উয়িন্ড’,‘মাস্টার্স অব ওয়ার’, ‘এ হার্ট রেইন’স এ-গনা ফল’, ‘লাইক এ রোলিং স্টোন’ গানগুলো তো যুদ্ধবিরোধী জাতীয় সংঙ্গীতই। আর সেখানেই ডিলান সীমাবদ্ধ থাকেন নি আমেরিকান ফোক সংঙের গন্ডিতে। তৈরী হয়েছে তার ইউনিভার্সাল অডিয়েন্স।

এই গীতি কবিতা ধারায় সাহিত্যের নোবেল দিয়ে নোবেল কমিটি কি বোঝাতে চাইছেন। বিস্তৃত করতে চাইছেন সাহিত্যের পরিধি? অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই তীব্র অসাধুবাদ। তবু এই বাদানুবাদের মাঝখানে নিজেই দুমিনিট উত্তর খুঁজি। এবং নিজের মধ্যেই আবিষ্কার করি নিজস্ব সত্যতা। তাই সংরাইটিং ও যে সাহিত্যের অংশ সেদিকে আমাদের নতুন করে দৃষ্টি ফেরানো উচিত। নোবেলের শর্তে নয়। সাহিত্যের স্বার্থে।

 

(ছবি সোর্সঃ গুগল )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *