কবিতা ও বাঙালী

প্রদীপ্ত গুপ্ত 


 

সে বৃষ্টি ভেজা দিনই হোক বা কঠোর আন্দোলনের মাটি হোক ; সে প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদনই হোক বা বিদ্রোহের আগুন – আমাদের বাঙালী সমাজের ক্ষেত্রে সবদিক থেকেই যেন কবিতা বিষয়টি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে ! স্বাধীনতার আগের ভারত ছাড়ো ; বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে আজ এই স্বাধীনতার ৭০ বছর পরের কলরব অবধি – সবেতেই বাঙালীর আন্দোলনের মুল কারিগর হয়ে উঠেছে এই কবিতা ! আবার প্রেমে – প্রেম সে প্রেম ভালোবাসা হোক ; প্রকৃতি প্রেম হোক বা খাবারের প্রতি প্রেম হোক ;বাঙালী সেখানেও এই কবিতারই অবলম্বন নেয় ; সে নিজের লেখা কবিতাও হতে পারে বা রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতিও হতে পারে ! মোদ্দা কথা স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু করে আজ এই একবিংশ শতক অবধি – রবীন্দ্রনাথ , নজরুল ; সুকান্ত ; জীবনানন্দ থেকে শুরু করে শঙ্খ ঘোষ ; জয় গোস্বামী ; নবারুণ বা শ্রীজাত –  এই কবিতাতেই বাঙালী খুঁজে পেয়েছে বেঁচে থাকার বহু রসদ ; ভাতের পাতে এক টুকরো মাছের মতোই আজ কবিতা প্রাসঙ্গিক এই সমাজে !

 

“তোমারেই যেন ভালবাসিয়াছি শত রূপে শতবার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার ।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতাহার-

কত রূপ ধরে পরেছ গলায় , নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার ”

কবি ও কবিতা বলতেই বাঙালীর হৃদয়ে যে নামটি সবার প্রথমে উঁকি দিয়ে যায় সেটি হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ! কবিগুরুর “অনন্ত প্রেম” এর উপর নির্ভর করেই বাঙালীর মন প্রেম সাগরে বছরের পর বছর যেন ভেসে চলেছে ; “ব্যক্ত প্রেম” এ বাঙালীর কখনো নিজের প্রেম প্রকাশ করে আবার “গুপ্ত প্রেম” এ প্রেম লোকায় মনের আড়ালে ; আবার কখনো প্রকাশ পায় “হঠাৎ দেখা” এর অনুভূতি !

শুধু প্রেম কেন ; সমাজের কুসংস্কার গুলো চোখে আঙুল দিয়ে আজও সমাজ কে দেখিয়ে দেয় কবিগুরুর কবিতা “দেবতার গ্রাস” ; “বিসর্জন” ইত্যাদি !আধুনিক নারীর প্রতিকৃতি এবং নারীর সম অধিকারের দাবি কখনো কখনো প্রকাশ পায় “চিত্রাঙ্গদা” এর মধ্যে দিয়ে ! আবার স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে সেই সময়ের বাঙালী পাশে পেয়েছিল তার “স্বাধীনতা” , “প্রার্থনা” , “ত্রান” , “ন্যায়দণ্ড” প্রভৃতিকে ! সুতরাং বাঙালীর যখন যেমন প্রয়োজন সেই হিসাবে তারা রবি ঠাকুরের কবিতাকে আজও নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে চলেছে !

 

এবার আসা যাক বিদ্রোহের কথায় ; আর বাঙালীর কাছে বিদ্রোহ মানেই তো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ! হ্যাঁ তবে নজরুল ইসলামের বিদ্রোহটা যেন একটু আলাদা ছিল ; তিনি একপ্রকার মানুষের মনের ভিতরকার অন্ধকারের বিরুদ্ধেই কলম ধরেছিলেন বলা যায় ;

“গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে কিছু নাই ; নহে কিছু মহীয়ান

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ , অভেদ ধর্মজাতি

সব দেশে ; সল কালে , ঘরে ঘরে তিনি মানুষের

জ্ঞাতি ।

‘পূজারী , দুয়ার খোল

ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায় দুয়ারে পুজার সময় হল’ ”

 

মানুষ কবিতার এই কিছু বাক্যর মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটাই কথা তা হল ঈশ্বরের বাস ঐ ক্ষুধার্ত পীড়িত গরীব মানুষ গুলোর মধ্যেই ; যাদের না আছে কোন অন্নসংস্থান আর না আছে কোন মাথা গোঁজার জায়গা ! শুধু আছে সমাজের অবহেলা ! আর সেই অবস্থা বর্ণনা করে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন কবি এবং তা কিন্তু সেই কবিতার মাধ্যমেই ! যদিও আজ স্বাধীনতার ৭০ বছর পর মানুষ যে কতটুকু তার কবিতার সারমর্ম বুঝেছে তা যথেষ্ট সন্দেহের ! আজ এই একবিংশ শতকেও সাম্য যেন প্রকৃত অর্থে এলো না ; থেকে গেলো ভেদাভেদ ও মানুষের প্রতি মানুষের বিকৃত মনোভাব ! এটা কি কবির ব্যর্থতা নাকি এই সমাজের ? আজকের এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বলাই যায় বর্তমান যুগের বাঙালীর স্বার্থে এ কবিতার হয়তো কোন মূল্য নেই !

 

আঠারো বছর বয়স ; ভরা যৌবনের সময় ; ভরা বসন্তের সময় ! আবার অনেকের কাছেই এই সময়টা নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য সংগ্রামের সময় ! বিপ্লব হোক বা প্রেম সবই আসে এই আঠারোয় ! এবং এই ক্ষেত্রেও বাঙালীর ভরসা হয়ে দাঁড়ায় সেই কবিতা । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এরকম এক ভবিষ্যৎ আন্দাজ করেই হয়তো লিখেছিলেন ;

“শুধু কবিতার জন্য জন্ম , শুধু কবিতার

জন্য কিছু খেলা , শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধ্যে বেলা

ভুবন পেরিয়ে আসা , শুধু কবিতার জন্য

অপলক মুখশ্রীর শান্তি এক ঝলক…………”

সত্যিই যেন এ কথা ; প্রেমের সময় মানুষ খুঁজে নেয় জীবনানন্দকে আবার কঠিন লড়াই ও বিপ্লবে হাজির হন স্বয়ং সুকান্ত ! এখন জীবনানন্দের কবিতায় যে প্রেম আমরা পাই তা দুপ্রকার ১) বাংলার রুপের প্রতি ভালোবাসা ২) আর বাংলার বিভিন্ন রূপে কোন এক অজানা নারীকে কল্পনা করে তাকে ভালোবাসা ! বাঙালীও কিন্তু প্রকৃতি আর নারী দুটোর প্রেমেই পড়ে !রবি ঠাকুরের সোনার বাংলার পাশাপাশি জীবনানন্দের কবিতায় কখনো রূপসী বাংলা কে পাওয়া যায় খেজুর জঙ্গলে ; তালবনে বা সুপুরির গন্ধে আবার কখনো বা পাওয়া যায় শীতের রাতে ধানের ক্ষেতে ; শ্মশানের হরিবোলে ; লক্ষ্মী পেঁচার ডাকে বা একফালি গড়ানে মেঘের পাশে ! বাঙালী তো স্বয়ং বনলতা সেন এর মোহতেও আক্রান্ত এখনও ;

“ হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো; 
চারিদিকে পিরামিড – কাফনের ঘ্রান ; 
বালির উপরে জ্যোৎস্না – খেজুর-ছায়ারা ইতস্তত

বিচূর্ণ থামের মতো ; এশিরিয় – দাঁড়ায় রয়েছে মৃত , ম্লান ।

শরীরে মমির ঘ্রান আমাদের – ঘুচে গেছে জীবনের সব লেনদেন ;

‘মনে আছে?’ শুধাল সে- শুধালাম আমি শুধু, ‘বনলতা সেন?’ ”

সত্যিই ওনার কবিতা গুলো না থাকলে হয়তো বাঙালীর প্রেম আজও অসম্পূর্ণ থেকে যেত যদিও রবি ঠাকুরও বাঙালীকে প্রেম বুঝিয়ে গেছেন তবুও জীবনানন্দের কবিতার উন্মাদনা যেন এক আলাদা অনুভূতি এনে দ্যায় মনে প্রানে !ভালোবাসার সাথে নিখিল বিষের সম্পর্ক টা তিনি না থাকলে সত্যিই অজানা থাকতো !

অন্যদিকে এই আঠারোতেই আসে বিপ্লব ; নিজের জীবনকে বাজি রেখে অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বারুদ টাও বিস্ফারিত হয় এই আঠারোয় ; আঠারো শেখায় সহনশীল হতে আর সমস্ত দুঃখ কষ্ট কে জয় করে এগিয়ে যেতে ! আর বাঙালীর এই প্রবণতার সলতে তে আগুন ধরিয়ে দ্যায় সুকান্তর কবিতা ; তিনিই শেখান আঠারোর মানে যেখানে কখনো লাইন দিতে হয় লঙ্গরখানায়ে বা যেখানে পূর্ণিমার চাঁদ ও হয়ে ওঠে ঝলসানো একটা রুটি যা বেঁচে থাকার সংগ্রামের অনুঘটক ;

“আঠারো বছর বয়স কি দুঃসহ

স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি ,

আঠারো বছর বয়সেই অহরহ

বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় উঁকি ।

আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়

পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাঁধা,

এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়

আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা ।

এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য

বাষ্পের বেগে স্টিমারের মতো চলে ,

প্রান দেওয়া-নেওয়া ঝুলিটা থাকে না শুন্য

সঁপে আত্মাকে শপথের কোলাহলে !”

এই তো আমাদের বাঙালী সমাজ যাদের সুখে দুঃখে ; আবেগে ; কোলাহলে ; বিপ্লবে বা প্রেমে সবেতেই কবিতা জড়িয়ে আর সেই কবিতাকেই বাঙালী ব্যবহার করে চলেছে নিরন্তর প্রতিক্ষেত্রে ! যেখানে দিকভ্রষ্ট বাঙালী বাড়ি ফেরে মধুসূদন দত্তের হাত ধরে ; যেখানে বাঙালী খিলখিলিয়ে হেঁসে ওঠে “আবোল তাবোল” “কাতুকুতু বুড়ো” সুকুমার রায়ের শব্দজালে ; আর বিরহের বেদনায় বাঙালীর আশ্রয় হয়ে ওঠে সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ;

“সেদিন এসেছিলো বসন্ত-

বুকে ছিল ভালোবাসা-অফুরন্ত ,

তুমি আসবে বলে-

এনেছিলাম ফুল-গোলাপ-কদম-কৃষ্ণচূড়া ;

লিখেছিলাম গান , কবিতা আর , ভালোবাসার ছড়া ।

তবুও তুমি এলে না- ভালোবাসা দিলে না…..

আজও তুমি জেনে নাও-

ভালোবাসা না দাও – শুধুই ভালোবাসা নাও”

 

আজকের আধুনিক কবিরাও এই ঘুন ধরা সমাজ সভ্যতার মানুষ গুলোকে তাদের অবনমনের মাত্রা বুঝিয়ে দেন এই কবিতাতেই ; কখনো “কবিতার শব্দগুলো দাউ দাউ করে জ্বলছে” নবারুনের কলমে আবার

কখনো তা প্রেম পাচ্ছে জয় গোস্বামীর কাছে

“তুমি আমাকে মেঘ ডাকবার যে বইটা দিয়েছিলে একদিন

আজ খুলতেই দেখি তার মধ্যে এককোমর জল।

পরের পাতায় গিয়ে সে এক নদীর অংশ হয়ে দূরে বেঁকে গেছে ।”

 

কখনো শ্রীজাতর “অভিশাপ” এ ভয় পেয়ে কবির কলম থামানোর চেষ্টা করেছে এই বাঙালী সমাজই আবার কখনো শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলতে শেখালেন “যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো” ! আজ বাঙালীর আঁতলামো থেকে কফি হাউসের আড্ডা সর্বত্রই এক বড় অংশের খোরাক হয়ে উঠছে এই কবিতাই ; বাঙালীর অলসতা ; উচ্চ স্তরীয় জীবন যাত্রা থেকে আন্দোলন বিপ্লবে আজও কবিতা ; তাই হয়তো নবারুণ লিখছেন ;

“বেশ, তবে সেই কবিতা লেখা হোক

আপনারা আসুন

এখানে যারা নেই তারাও আসুক

অনেক ভালোবাসা, অনেক বারুদ , অনেক কান্নার থেকে

সেই আশ্চর্য কবিতা লেখা যায়

আমি সেই কবিতার কথা একটু

ভাবতে পারি মাত্র”

 

 

ইলাসট্রেশন ঃ ফারজানা মণি 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *