হাসির গানে কাজী নজরুল ইসলামের স্বকীয়তা

মৃদুল সান্যাল

 

কন্ঠ সংগীত হাস্যরসরূপায়নের খুব একটা প্রশস্ত জায়গা নয়। কোথাও গানে হাস্যরসের বিপুল রূপায়ণ ঘটে নি। হাস্যরসের জন্য প্রশস্ত স্হান হচ্ছে অভিনয়। সেখানেই এর সর্বোত্তম স্ফূর্তি ঘটেছে। বাংলা গানের ধারায় হাস্যরসের ধারাটি ক্ষীণ।বলতে গেলে, দিজেন্দ্রলাল রায়ের রচনায়ই একবার উচ্ছলিত হয়ে উঠেছিল আশ্চর্য গভীরতায়। ব্যঙ্গ এবং রঙ্গ উভয় শ্রেণীর গান রচনাতেই তিনি সিদ্ধ ছিলেন।আধুনিক কালে বাংলা হাস্যসংগীতের পটভূমিটি তিনিই রচনা করেন এবং পরোজ্জ্বল রূপটি তার রচনাতেই প্রকাশ পায়। ইংরেজ শাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে আসা এবং শিক্ষিত বাঙালির অতি প্রাশ্চাত্যপ্রীতই ছিল ব্যঙ্গগীতির বিষয়। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের রচনায় এর সূত্রপাত।
বাংলা হাসির গানের এই পটভূমিতেই কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব। সংগীত রচয়িতারূপে এটা তার কোণ প্রধান প্রবণতা নয়। তবে হাসির গানের ক্ষেত্রে নজরুলের কাজ নগণ্য নয়। এতদিন তার হাসির গানগুলো যথেষ্ট পরিমাণে গ্রন্হিত হয়নি বলে ঠিক অনুধাবন করা যায় নি। আজকাল যখন গানগুলো গ্রন্থিত অবস্হায় পাওয়া যাচ্ছে এবং আরো হাসির গান সংগৃহীত হচ্ছে, তখন ঠিক বোঝা যাচ্ছে যে এব্যাপারেও নজরুল যথেষ্ট কাজ করেছিলেন। আবদুল আজীজ আল আমান সম্পাদিত নজরুলগীতি অখন্ড-এর দ্বিতীয় সংস্করণে ১০১ টি হাসির গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং আরো কিছু গান সংগৃহীত হয়েছে।
ব্যঙ্গ ও রঙ্গ উভয় ধারাতেই গান রচনা করেছিলেন নজরুল। ব্যঙ্গগীতির অধিকাংশই দেশচেতনার পটভূমিতে রচিত। এর মুখ্য বক্তব্য রাজনৈতিক। সাইমুন কমিশনের রিপোর্ট,  রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স, ডোমিনিয়ন স্টেটাস, লীগ অব নেশন প্রভৃতি রাজনৈতিক ব্যঙ্গগীতি। সর্দাবিল, জাতের জাঁতিকল প্রভৃতি সামাজিক বিষয়ে রচিত ব্যঙ্গ গান
দেশাত্মবোধক গানের অধ্যায়ে দেশাত্মবোধক ব্যঙ্গগীতিরূপে এসব গান আলোচিত হয়েছে। গান হিসেবে আখ্যায়িত হলেও এসব গান রচনায় গীতোচিত দৈর্ঘ্য রক্ষা পায় নি। প্রকৃতপক্ষে গানরূপে কথিত হলেও এগুলো কবিতার আকারেই রচিত।
দেশাত্মবোধক গানের অধ্যায়ে দেশাত্মবোধক ব্যঙ্গগীতিরূপে এসব গান আলোচিত হয়েছে। গান হিসেবে আখ্যায়িত হলেও এসব গান রচনায় গীতোচিত দৈর্ঘ্য রক্ষা পায় নি। প্রকৃতপক্ষে গানরূপে কথিত হলেও এগুলো কবিতার আকারেই রচিত।
দেশাত্মবোধক গানের অধ্যায়ে দেশাত্মবোধক ব্যঙ্গগীতিরূপে এসব গান আলোচিত হয়েছে। গান হিসেবে আখ্যায়িত হলেও এসব গান রচনায় গীতোচিত দৈর্ঘ্য রক্ষা পায় নি। প্রকৃতপক্ষে গানরূপে কথিত হলেও এগুলো কবিতার আকারেই রচিত।
নজরুল সংগীতের অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক বিভাগগুলির মধ্যে হাসির গান বিশেষ বৈচিত্রের দাবি রাখে।গানগুলি সংখ্যায় বিস্তর না হলেও কবি স্বল্পসংখ্যক হাসির গানের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ করেছেন তার সুতীক্ষ্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক অনুভূতি শক্তিকে। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘চন্দ্রবিন্দু’ এবং ‘সুর সাকী’ সংগীত গ্রন্থ দুটিতেই হাসির গানের সম্ভার পরিবেশিত হয়েছে। তার রচিত হাসির গানগুলিকে যদি কয়েকটি বিভাগে চিহ্নিত করি, তাহলে কবির দৃষ্টিভঙ্গীর যথার্থ মূল্যায়ন সম্ভব।

হাসির গানের বিষয় যাই হোক না কেন, প্রত্যেক বিষয়ের পেছনেই আছে কিছু না কিছু অসঙ্গতি,- তা সামাজিক, পারিবারিক, রাজনৈতিক অথবা ব্যাক্তি কেন্দ্রিক-ই হোক না কেন।মানুষের জীবনে পরিবারের স্হান যেহেতু সকলের আগে, তাই শৈশব থেকেই পারিবারিক অসঙ্গতিগুলি মানুষকে যেমন পীড়া দেয়, তেমনই সৃষ্টি করে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের অনুভূতি। আপন মনের বিরক্তিও প্রকাশিত হয় ব্যঙ্গের মাধ্যমে। কাজী নজরুল ইসলামের পারিবারিক সমস্যা কেন্দ্রিক হাসির গানগুলিতে এমনই কিছু সমস্যাকে হালকা করে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষিত হয়। এ ধরনের গানগুলিকে ইংরেজি পারিভাষিক শব্দের ঠিক কোন শ্রেণীতে ফেলা যায় তা পরিষ্কার নয় তবে আমাদের বাংলার মানুষের মনের ভাবগত দিক থেকে বিচার করলে যদি গানগুলিকে কোন তাত্ত্বিক শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত না করে শুধু মাত্র হাসির হান বলেই চিহ্নিত করি, তাহলে বোধহয় নির্মল হাসির সুযোগ পাওয়া যাবে। যেমন: “বিয়ে করে গদাই, দেখলে সে আর উঠতে নারে ভারী ঠেকে সদাই “।।
ব্যঙ্গাত্মক গানগুলির মধ্যে বিচার করে দেখলে সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক গান সৃষ্টিতে নজরুল সিদ্ধহস্ত। সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার ফলে সমাজ ও রাজনীতি বিষয়টি কবির কাছে ছিল অতি সহজ বক্তব্যের বস্তু। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নজরুলের ইতিহাস চেতনাও। ‘চন্দ্রবিন্দু’ সংগীত গ্রন্থে ‘প্রাথমিক শিক্ষাবিল’, ‘সাইমন কমিশনের রিপোর্ট’, ‘সর্দা বিল’, ‘ডোমিনিয়ন স্টেটাস’, ‘লীগ অব নেশন’ ও ‘রাউন্ডটেবিল কনফারেন্স’ এই গুলি কাজী নজরুল ইসলামের সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতার ইঙ্গিত বহন করে। সমাজে জাত বিভাজনের যে সমস্যা, তা শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানের ধর্মবিরোধ নয়, হিন্দু ধর্মের বর্ণাশ্রমের দ্বারা যে বিভেদনীতি মানুষের মনে গাঁথা হয়ে গেছে, তারই ফলে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব কোন অস্বাভাবিক কথা নয় অথচ সমাজে সত্যি কি একে অপরকে ছেড়ে জীবন যাপন করা সম্ভব! সেই প্রশ্নই করেছেন নজরুল তার ‘জাতের জাঁতিকল’ গানটিতে। “মেথরানীটা বললে, বাবু জাত জান কি তোমার মায়ের? “।।
প্রেম বিষয়ক হাসির গানগুলিকে মূলত দুটিভাগে ভাগ করতে পারি।  রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক ও মনুষ্যপ্রেম বিষয়ক সংগীত। রাধাকৃষ্ণের প্রেম বিষয়ক হাসির গানে রাধা ও কৃষ্ণ চরিত্র দুটি একবারেই বাস্তব জগতের। বৈষ্ণব পদাবলির প্রেমতত্ত্ব এখানে বিরল, রাধা ও কৃষ্ণ একেবারেই আমাদের আশেপাশের গ্রাম্য চরিত্র। তার মধ্যে দেবত্ব আরোপের কোন চেষ্টাই কবি করেননি। চরিত্রগুলি একেবারেই লৌকিক নায়ক – নায়িকার সাদামাটা বৈশিষ্ঠ্য নিয়ে বর্তমান, কখনো বা আল্ট্রা মডার্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘পূজারিণী ‘ নাট্যের গান ‘আমায় ক্ষম হে ক্ষম নম হে নম’র সুরে নজরুল ইসলাম রচনা করেন ‘ওহে শ্যামো হে শ্যামো’ প্যারোডিটি। কবি শ্যামকে চিরাচরিত ‘কদম্বডাল’ থেকে নামিয়ে আনতে চেয়েছেন ব্যস্ত আধুনিক জগতে। কারণ একজন শ্যামের উদ্দেশ্যে আর রাধা, চন্দ্রাবলী, ললিতা, বিশাখা, বৃন্দাদূতী সকলের কাজ ছেড়ে ঘুরে বেড়াবার সময় নেই। আধুনিক প্রেক্ষাপটে যমুনার বদলে কলকাতা আর ঢাকার লোকের নমুনাকেই কবি যথেষ্ট বলে মনে করেছেন। সুতরাং ব্যস্ততম জগতে শ্যামকে নামতে হবে কদম্বডাল ছেড়ে। “ওহে শ্যামো হে শ্যামো,নামো হে নামো কদম্ব ডাল ছাইড়ে নামো, তুমি দুপুর রোদে বৃথাই ঘামো ব্যস্ত রাধা কাজে”।।
রাধা কৃষ্ণ প্রেম বিষয়ক ব্যঙ্গসংগীতে কবি কখনো কখনো নেমে এসেছেন কঠিন বাস্তবিক মূল্যবোধের হাস্যকর বক্তব্য প্রকাশে। তখন গানে রাধা কৃষ্ণ শুধুমাত্র দেবত্ব ত্যাগ করেননি,পরিণত হয়েছে মনুষ্যতর জীবে। “আমি দেখেছি তোর নামে” গানটিতে আয়ান ঘরণী রাধা বর্ণিত হয়েছে গাভীরূপে। সে রাখাল বালকের সন্ধান পেয়ে গোয়ালঘরের দড়ি ছিড়ে চলে যায় কদমতলায়। ঘোষবংশজাত আয়ানের কাছে স্ত্রী রাধার চেয়ে বোধহয় গোয়ালের গরুটির মূল্য অনেক বেশি।  এমনি বাস্তবিক ধারণাকে কাজে লাগিয়ে নজরুল তার গানটিতে রাধা=গাভী এমন এক আপাত হাস্যকর সমীকরণের সমাধান করলেন। যেমন: তুই মোর গোয়ালের দড়ি ছিড়ে রাত-বিরাতে বেড়াস চড়ি”।।
সর্বপ্রকার সাংগীতিক ঔচিত্য রক্ষা পেয়েছে নজরুলের হাসির গানে। জনপ্রিয়তার নিরিখেও কবির অনেক হাসির গান বা রঙ্গগান সাফল্য অর্জন করেছিল। এমন অনেক হাসির গান রয়েছে যেগুলো আজো শ্রোতাদের অনাবিল আনন্দে আপ্লুত করতে পারে। নজরুল সৃষ্ট কতিপয় হাসির গানের প্রথম পংক্তি নিম্নরূপ :
> “আমার খোকার মাসী শ্রী অমুকবালা দাসী”
> “আজ নাচনের লেগেছে গাঁদি গো”
> “আজকে হোরী ও নাগরী”
> “আবু আর হাবু দুই ভায়ে সদাই ভীষণ দ্বন্দ্ব”
> “আমার ঠনঠনিয়ার চটি”
> “আমার হরিনামে রুচি”
> “আমি দেখন-হাসি”
> “আমি মুলতানী গাই”
> “আর পারিনে সাধতে লো সই এক ফোঁটা এই ছুঁড়িকে”
> “আলাপের যে ফুসরতই নেই”
> “উচ্ছে নহে ঝিঙে নহে নহে সে পটল”
> “এই গাধার খাটুনির চেয়ে অনেক ভালো দাদার বাড়ী”
> “ও তুই উল্টো বুঝলি রাম”
> “ওরে বাবা এর নাম নাকি পূজা”
> “ওরে হুলো রে তুই রাত-বিরেতে ঢুকিস নে হেসেল”
> “কলির রাই কিশোরী”
> “কালো জাম রে ভাই”
> “গিন্নীর ভাই পালিয়ে গেছে”
> “ঘরে কে গো শালাজ নাকি”
> “ছিটাইয়া ঝাল নুন”
> “টিকি আর টুপিতে লেগেছে দ্বন্দ্ব”
> “দয়া করে দয়াময়ী ফাঁসিয়ে দে এই ভুঁড়ি”
> “দুপেয়ে জীব ছিল গদাই বিবাহ না করে”
> “দে গরুর গা ধুইয়ে”
> “প্রিয়ার চেয়ে শালী ভালো”
> “হে ভ্যাবাকান্ত”
প্রভৃতি হাসির গানগুলো সেকালে বেশ আলোড়ন তুলেছিল। রঞ্জিত রায়, হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিমল দাসগুপ্ত প্রমুখ প্রতিভাবান গায়কের কল্যাণে এসব গান বাঙালি শ্রোতাদের অনাবিল আনন্দ দিয়েছিল। যে ধরনের অসংগতি, বৈপরীত্য বা উদ্ভটকে অবলম্বন করে এসব গান রচিত তা আজো আমাদের মনকে আমোদিত করে।।

 

 

 

(ছবি সোর্সঃ গুগল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *