পিপলস সঙ

প্রদীপ্ত গুপ্ত
সাল ১৯৩৬ ! ছেলেটার বয়স সবে ১৭ , বাবা সঙ্গীতজ্ঞ ও মা বেহালাবাদক হওয়া সত্ত্বেও সঙ্গীতের প্রতি কোনদিনই সেরকম ঝোঁক ছিল না তাঁর ! ছোটবেলা থেকেই সে একজন ভালো সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন দেখত , কিন্তু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয় নিয়ে পড়ার সময় উৎসাহ হারিয়ে ফেলে ছেলেটি ! সে তখন শুধু মনের মতো একটা কাজের কথা ভাবত , কিন্তু সেই কাজ যেন অনেকটাই মরীচিকার মতো – কিছুতেই ধরা দিচ্ছিল না তাঁর কাছে ! হঠাৎ একদিন মেলায় বেড়াতে গিয়ে সেখানে একটি বিশেষ রকমের বাদ্যযন্ত্রের বৈচিত্র্য ভরা আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে ছেলেটি ! যন্ত্রটির নাম ছিল “ব্যাঞ্জো” ! আর ঠিক এখানেই সবকিছুর শুরু !
পিটার সিগার –যিনি ছিলেন সারা পৃথিবীর সর্বহারা ও বঞ্চিত মানুষের শ্রম যন্ত্রণা এবং স্বপ্নের সুরের সন্ধানী ,  জন্মগ্রহণ করেন ৩ রা মে , ১৯১৯ , নিউ ইয়র্ক উপকূলের প্যাটারসন শহরে , বাবা চার্লস সিগার ছিলেন সঙ্গীতজ্ঞ ও বিশ্বশান্তি আন্দোলনের সমর্থক ; মা এডসন সিগার ছিলেন নিপুণ বেহালাবাদক ! পিট নিজে গানের তালে তালে ম্যান্ডেলিন বাজাতেন । লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও বিপ্লবের ঝড় কীভাবে তুলতে হয় তা পিট না থাকলে আজও অজানা থেকে যেত ! প্রকৃতি , সমাজ ও সুর সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন অনুশীলন করে সঙ্গীত চর্চায় ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতেন তিনি !
১৯৪২ সালে পিট সিগারকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হয় ! তবে যুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধ শুরু করতে একেবারেই দেরি করেননি পিট ! পুরোনো বন্ধু লিহেজ , রনি গির্বাট ও ফ্রেড হেলারম্যান প্রমুখ দের নিয়ে গড়েন একটি গানের দল “THE WEAVERS” যা পূর্বে “ALMANAC SINGERS” গ্রুপ নামে পরিচিত ছিল ! পিট নিজে ছিলেন এই দলের সবথেকে সুপরিচিত মুখ ! এই দলটি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে মার্কিন মুলুকে এবং একটা সময় সেটি এতটাই প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় যে পিট নিজেই কিছু নির্দিষ্ট স্থানে নিজের লেখা গান শুনিয়ে তাদের আয় ১৫ ডলার অবধি বৃদ্ধি করে নিতে পারতেন ! এই দল মুলত যুগোপযোগী লোকসঙ্গীত গাইত এবং ১৯৫০ এর দিকে লোকসঙ্গীত জগতে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো “THE WEAVERS” ! তাদের গাওয়া গান প্রায় ১৩ সপ্তাহ এক নম্বর স্থানে বহাল ছিল ! পিট সবসময়তেই সমাজ সংস্কৃতির প্রয়োজনে এবং পিছিয়ে পড়া সমাজে গতি সঞ্চার করার জন্য নিজের গান ব্যবহার করতে ভালবাসতেন কিন্তু তিনি কখনই সঙ্গীতের বিকৃতি মেনে নিতে পারতেন না ! একটা সময় মতাদর্শ বহির্ভূত কার্যকলাপ সম্পাদন করার জন্য তিনি “THE WEAVERS” ভেঙে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন নি !
১৯৪৬ এর কথা – পিট প্রকাশ করলেন একটি গানের পত্রিকা “People’s song bulletin” !পত্রিকাটি গঠন হয়েছিলো “TEMPORARY ORGANISING COMMITTEE” এবং “ADVISORY COMMITTEE” নিয়ে ! যেখানে “TEMPORARY ORGANISING COMMITTEE” এর সদস্য ছিলেন পিট সিগার , লি হেজ , সাইমন রেডি, লাইডিয়া ইনফেল্ড প্রমুখরা এবং “ADVISORY COMMITTEE” তে ছিলেন সল্ অ্যারন্স , শার্লট অ্যান্টনি , বেরনি বেল , অস্কার ব্র্যান্ড সহ আরও ২৯ জন ! কি ছিল এই পত্রিকার মূল মন্ত্র ? সেটা জানতে পারা যায় bulletin এর copyright থেকেই – “ The people are on the march and must have songs to sing . Now , in 1946 the truth must reassert itself in many singing voices . There are thousands of unions , people’s organizations , singers and choruses who would gladly use more songs . There are many song writers ,  ameteur and professional , who are writing these songs . It is clear that there must be an organization to make and send songs to labor and the american people through the land . TO do this job we have formed PEOPLE’S SONG , INC. We invite you to join us ! “
মূলত আমেরিকার সাধারণ মানুষ ও শ্রমজীবী মানুষের নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে এই গানের পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো ! এখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে রাজরোষে তো পড়তেই হয় !  পিটের ক্ষেত্রেও অনেকটাই তাই হয়েছিলো ! মার্কিন প্রতিনিধি সভায়ে অভিযুক্ত করা হয় তাঁকে এবং তাঁর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ ও মার্কিন বিরোধী কার্যকলাপ সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হয় ! এই নজিরবিহীন আক্রমনের জবাবে পিট কিন্তু চুপ করে থাকেন নি বরং কোন ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক মতাদর্শে তৃতীয় কোন ব্যক্তির প্রশ্ন করার অধিকার কতখানি থাকতে পারে তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সভায়ে উপস্থিত সকলকে ! এমনকি যে গানটি নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো , সভায় তিনি সকলের সামনেই সেই গানটি আরও একবার গেয়ে শোনান ! শেষ অবধি তারা পিট সিগারকে এক বছরের কারাবাসে দণ্ডিত করেন এবং তাঁর গান নিষিদ্ধ করার রায় দেন ! তবে এই রায় উচ্চ আদালতে খারিজ হয়ে যায় , কিন্তু টেলিভিশনে তাঁর গান গাওয়ার উপর জারি হয়ে যায় নিষেধাজ্ঞা ! পিটের জীবন সংগ্রাম কিন্তু এখানেই থামল না ! ৬০ এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে তিনি গাইলেন “Where have all the Flowers” যে গানটির অনুবাদ করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায় “কোথায় গেলো ফুলগুলো ? হারিয়ে গেছে সেই চাহনি গুলো । শুধু কি বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধে টিকে যাবে এতো সুন্দর এই গ্রহ ?”
সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে আবার ফিরে আসতে হয় তা তিনিই শিখিয়ে গেছেন এই সমাজকে ! আমেরিকায় তাঁর সাংস্কৃতিক নির্বাসনের পর সেই মার্কিন সরকারই তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান প্রদান করতে বাধ্য হয় ! ১৯৯৪ তে যে দশ জন শ্রেষ্ঠ আমেরিকান জাতীয় পুরষ্কার গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে পিট ছিলেন অন্যতম ! ১৯৯৯ সালে গ্রহণ করেন কিউবার শ্রেষ্ঠ সম্মান “ফেলিক্স ভ্যারেলা মেডেল” ! সহজ সরল এই প্রতিভাবান সঙ্গীত শিল্পী – কখনো গেয়েছেন শ্রমের গান , কখনো শান্তির পক্ষে গান , কখনো বা প্রেমের গান !মোট ১৮০০ টি রেকর্ডিং করেছিলেন সিগার। আমেরিকার একটি চার্চের এক সম্পূর্ণ অচেনা গোস্পেল “WE WILL (পিট নিজে WILL শব্দটি পাল্টে SHALL করে নেন) OVERCOME” কে মার্টিন লুথার কিং এর সভায় গেয়ে জনপ্রিয় করে তুলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে তথা আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্টে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন সেই পিট সিগার ! পল রবসনের গানের অনুষ্ঠানে আক্রমনের প্রতিবাদ থেকে শুরু করে বারো জন কমিউনিস্ট এর বিরুদ্ধে সাজানো বিচারের প্রতিবাদ – রাষ্ট্রীয় পীড়ন ভোগ করা সত্ত্বেও প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে কখনই সরে আসেননি তিনি !
 ১৯৬৩ ও ১৯৯৬ সালে তিনি ভারতের পশ্চিম বঙ্গে আসেন ! প্রথমবার (১৯৬৩) পার্ক সার্কাস ময়দানে শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়ে পরিবেশন করেন তাঁর জগত বিখ্যাত লোকসঙ্গীত গুলি ! দ্বিতীয় বার আসেন ১৯৯৬ তে , সেই সময় তাঁকে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করা হয় ! কলকাতায় আরও একটি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে পিট বলেন “ কোকা কোলা খাও , কারণ খেতে তুমি বাধ্য , কিন্তু তোমার দেশের নারকেলের জল খেতে ভুল না” ! নিবারণ পন্ডিতের মতো লোকসঙ্গীত লিখতে না পারার জন্য আক্ষেপ প্রকাশ অথবা কলকাতার শিশুদের মুখে নিজের গাওয়া গান শুনে মেতে ওঠা – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে দেয় যে তিনি মাটিতে পা রেখে চলতেই ভালোবাসতেন ।
হাতে গিটার , বাঁশি আর ব্যাঞ্জো ধরে থাকা এই মানুষটি যখন বুঝেছিলেন যে তাঁর বয়স তাঁকে আর এগিয়ে যেতে দিচ্ছে না , তাঁর গলার আওয়াজ কমে আসছে , কমে আসছে আঙ্গুলের জোর , ঠিক তখনই কিন্তু তিনি তাঁর বিপ্লবের মশাল তুলে দেন পরবর্তী প্রজন্মের হাতে ! ২৭ শে জানুয়ারী , ২০১৪ , – অধিকার আন্দোলন , শ্রমিকের আন্দোলন  , মানবধিকার আন্দোলনের ঝাণ্ডা আজকের যুবা দের হাতে দিয়ে চিরনিদ্রায় ঢলে পড়েন পিট ! আজকের এই সামাজিক ও মানসিক অবক্ষয়ের দিনে তিনি হয়তো আজও কোথাও আমাদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মানে টা শিখিয়ে দেন !
(ছবি সোর্সঃ গুগল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *