আন্দ্রেই তারকোভস্কি

সাব্বির পারভেজ সোহান 

 

আত্মিক নির্বাণ এবং বৌদ্ধিক বিবর্তনে তারকোভস্কি মগ্ন। তারকোভস্কি অনুবাদে বিশ্বাসী নন, সুতরাং যারা আক্ষরিক অনুবাদে আসক্ত তাঁদের জন্য তারকোভস্কি দুষ্পাচ্য তো বটেই, সঙ্গত কারণে যন্ত্রনাদায়কও।তারকোভস্কি ব্যাকরণ জানতেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গুরুর ছিল।তবে তারকোভস্কির সৃজন প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিকতাঁর বদলে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়েছে শাশ্বত একাত্মবোধের চেতনা।এ একাত্মবোধ সময় ও চিন্তার, স্থান ও ক্রিয়ার, স্বপ্ন ও বাস্তবতার। সময়ের ভাস্কর তারকোভস্কি তাই কাঠামোগত প্রচলিত দৃশ্যবিন্যাসে আগ্রহী নন, গুরু আগ্রহী প্রবাহমানতায়।নাটুকে যুক্তিভিত্তিক ক্রিয়া নয়, তারকোভস্কি দর্শনে বিবেচ্য দান্দ্বিকতা।যা নাক্ষত্রিক প্রাবল্য নিয়ে প্রতিভাত তাঁর চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহারের নমুনায়। তারকোভস্কি স্বপ্ন তাড়িত।জীবনানন্দের মতই মানব-প্রবৃত্তি ও অনুভূতির সরল,সাবলীল,স্বতস্ফুর্ত ক্রিয়ার বাস্তবতায় তিনি স্বপ্নমগ্ন। আর তাই হয়তো বালসুলভ স্বপ্নদোষে অভ্যস্ত চলচ্চিত্র দুনিয়া তারকোভস্কিতে বিনোদিত হয়না। বিনোদন এবং কলার মাঝে উদ্দেশ্যমূলক পার্থক্য দাড় করানো হয়। যথায় বিশুদ্ধ তারকোভস্কি পরিণত হন ভিনগ্রহের ব্রাত্য আদিমাত্মায়; তথায় দর্শকের চোখ আর ধর্ষকের চোখে পার্থক্য কতটুকু?

স্টকার(১৯৭৯)

তারকোভস্কি ধীর, তারকোভস্কি কাব্যিক, তারকোভস্কি মাংসপিন্ডের উদগ্র চিত্রায়নে অনাগ্রহী, তারকোভস্কি নিসর্গকামাক্রান্ত। তারকোভস্কির চরিত্ররা একা হাতে রাবণবধের বিচারে অযোগ্য। “ইভান্স চাইল্ডহুড” এ তাঁর ইভান হয়তো গ্রীক নাটকের হিরোইজিম আক্রান্ত, যা নিয়ে স্বয়ং গুরু নিজেই হতাশ ছিলেন।কিন্তু, তারকোভস্কির জগতে কমবেশি প্রতিটি চরিত্রই বৈপরীত্য ও বহুব্রীহিতায় ভরপুর। তারা যতনা ফিজিকাল অ্যাকশনে সুচারু, তাঁর থেকে তারা বেশি ধারালো উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে। তারকোভস্কি অন্তর্দাহে আসক্ত। তারকোভস্কি স্বপ্নের নির্মাতা, আর তাই হয়তো তারকোভস্কির চরিত্ররা শুন্যে ঊড়ে দেশ ও দশকে আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাচাতে পারেনা। তারাও শুন্যে উড্ডীন হয়, তবে তা কামনা,দহন,পরাবর্তনের দায়ে;পৌরুষের দায়ে নয়।   তারকোভস্কি স্মৃতির বিনির্মানে সচেষ্ট।মানবিক বন্ধনগুলো নিয়ে তিনি অনেক বেশি যত্নবান ও প্রেমাতুর।আর তাইতো “মিরর” সিনেমায় বারবার তাঁর ফ্রেমে উঠে এসেছে তাঁর কবি বাবার এপিফ্যানি।বৃদ্ধা  মায়ের তারুন্যকে আয়নায় আনা হয় বারবার, বার্গম্যানীয় বিষণ্ণতা নিয়ে মুর্তিমান কবিতা হয়ে ওঠেন মার্গারিতা তেরেকোভা। তারকোভস্কি কি শৈশব স্মৃতি-ভারাক্রান্ত?-হ্যা। যদিও ক্রমশ বিবর্তনে এই স্মৃতিকাতরতা রূপ নিয়েছে প্রবীন দার্শনিকের আত্মকথনে। যার দৃষ্টান্ত আমরা পাই শেষ দুই সৃষ্টি “নস্টালজিয়া” ও “স্যাক্রিফাইস” এ।

আন্দ্রেই রুবেলভ(১৯৬৬)

তারকোভস্কির “সোলারিস” সাদামাটা বিচারে এবং চেনা পরিভাষায় কল্পবিজ্ঞান ঘরানার অন্তর্ভুক্ত।কিন্তু, তা স্পেশাল এফেক্টস এবং ন্যারেটিভ স্ট্রাকচারের ব্যাকরণে গড়ে ওঠা সাসপেন্সের ধারে কাছে দিয়ে যায়না। ব্যাক্তি এবং ব্যাক্তির দহনই হয়ে ওঠে মুখ্য বারেবারে। আর ব্যাক্তির আশ্রয়ে তারকোভস্কি ক্রমশ প্রশ্ন তোলেন অথবা প্যারাডক্স তুলে ধরেন মহাবিশ্ব ও মহাবিশ্বের প্রবাহমানতার পেছনের মূল সুত্র সম্পর্কে; আবিষ্কার করতে চান এক এবং সমগ্রের মাঝের সম্পর্ক। অথোরিটি এবং আমালাতন্ত্রকেও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন। আর তাই হয়তো সোলারিসে যন্ত্রকে নিরীক্ষনের উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীর মাটি ত্যাগ করা মানুষরাই শিকার হয় যন্ত্রের নিরীক্ষনের।যন্ত্রের মাঝে প্রকাশ ঘটে মানবিক আবেগের, আর মানুষ অবাক হয়ে অথচ অসহায়ত্ব-জর্জরিত-নির্লীপ্ততায় আবিষ্কার করে নিজেদের যান্ত্রিকতার।   তারকোভস্কি বরাবর দাবী করেছেন তাঁর দৃশ্যরা স্বতঃক্রিয়।কোন গোপন বক্তব্য, দুরূহ তত্ব লুকিয়ে রেখে তিনি দর্শককে বঞ্চিত করতে চাননা এবং চলচ্চিত্র মাধ্যমকে বোকা বানাতে তিনি আগ্রহী নন।চলচ্চিত্রের সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাষার স্রষ্টা তিনি। তারকোভস্কির চলচ্চিত্র নাটক নয়, সাংগীতিক সুষমা তাতে ভরপুর, চিত্রশিল্পীর মায়াময়তা তাতে পরিব্যাপ্ত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারকোভস্কির চলচ্চিত্র একান্তই চলচ্চিত্র।আর তাই হয়তো অর্থ-সন্ধানী দর্শকেরা তারকোভস্কির চলচ্চিত্র ভাষার নিজস্বতা,স্বকীয়তার ব্যাপারটা ভুলে মেরে দিয়ে ব্যাস্ত হন তাকে মধ্যযুগীয় এবং দুর্বোধ্য দাবী করায়।

ইভান্স চাইল্ডহুড(১৯৬২)

তারকোভস্কি ধার্মিক কিন্তু ধর্মপ্রচারক নন; বিশ্বাসী কিন্তু ভন্ড নন; মধ্যযুগীয় চিত্রশিল্পের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্যময়তা তাঁর আত্মজ কিন্তু তিনি নিষ্ঠুর নন। তারকোভস্কি মতামত দেন, ফতোয়া জারি করেননা। তারকোভস্কি জলজ; তবে তরল স্বপ্নদোষ নয়, স্মৃতি ও স্বপ্নে আচ্ছন্ন।তারকোভস্কির ফ্রেমে পুড়ে ছাই হয় মানব-মানবীর মন,চেতনা অথবা গৃহ,বৃক্ষ,দায়বদ্ধতা।“স্টকার” এর অভিযান তাই রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়তার স্থানিক কাঠামোয় ক্রিয়াশীল হয় মানবমনের সময়ের মাত্রায়।”আন্দ্রেই রুবেলভ”এর মৌন সাধনা, সৌম্য দহন এ ঘুরে ফিরে আসে অধিবিদ্যা,দর্শন,ইতিহাস। পদার্থবিজ্ঞান আর মনোবিজ্ঞান উভয়ই গুরুত্বপুর্ন তারকোভস্কি দর্শনে। তবে একজন দিনমজুরের জন্য তারকোভস্কি কতটা উপযোগী ও প্রয়োজনীয়?…সোজা কথা- আমার কাছে এ প্রশ্নের উত্তর নেই।তবে কিনা, উপযোগ ও প্রয়োজনীয়তা শিল্পকলার আবশ্যিক-বিশিষ্ট-ধর্ম কিনা সে প্রশ্নও আমার মনে ঘুরপাক খাঁয়। আর তারকোভস্কি আগে শিল্পনিষ্ঠ না সত্যনিষ্ঠ এমন তর্কের আগে একটু বুঝে নিলে সুবিধা যে, তারকোভস্কি এবং তাঁর চলচ্চিত্রের বিচার কোন নির্দিষ্ট তন্ত্র,মতবাদ,আদর্শের মানদণ্ডে করাটা হয়তো সুবিধের হবেনা।তারকোভস্কি নিজেই এক স্বতন্ত্র দার্শনিকরূপে আমার কাছে অস্তিত্বময়।   তারকোভস্কি দৃশ্য, শব্দ, ঘটনার সমন্বয়ে পরিবেশ রচনা করেন;নিসর্গ ও কংক্রিটের সঙ্গম ঘটান।চলচ্চিত্রের সৃজনপ্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন আণুবীক্ষণিক দৃষ্টির অধিকারী।চিত্রনাট্য,সেট ডিজাইন,সিনেমাটোগ্রাফি,সাউন্ড ডিজাইন সহ প্রতিটি শাখায় তিনি মনযোগী। আর তাই হয়তো নামমাত্র পরিচালক বা নির্দেশক তিনি নন, তিনি চলচ্চিত্রস্রষ্টা।তাঁর ফ্রেমের দেয়ালরাও কবিতা আবৃত্তি করে; আণবিক ক্ষুদ্রতাও লাভ করে আকাশের বিশালতা।তারকোভস্কির বিশাল ক্যানভাসে ক্ষুদ্র এবং বৃহতের সহাবস্থান অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং স্বতন্ত্র। তারকোভস্কি সম্পর্কে আজ অবধি সবচেয়ে দিব্য এবং মনে গাঁথার মত মন্তব্য আমি পেয়েছি আমার ১১ বছর বয়সী ভাগ্নের থেকে।“মিরর” দেখার পর যার মন্তব্য ছিল-“মামা, সিনেমাটা বিকালের মত”।আমি বিস্মিত ছিলাম এবং আনন্দিত ছিলাম। কেননা, “ব্র্যান্ডেড-কাল্ট” হয়ে ওঠার চাইতে একজন শিশুর কাছে একটা সিনেমার “বিকাল” হয়ে ওঠাটা আমার কাছে অনেক বেশি মানবিক ও মুগ্ধকর।

মিরর(১৯৭৫)

তারকোভস্কি তাই সাময়িক নন, তিনি দীর্ঘস্থায়ী(প্রগলভ উচ্চারণের তোয়াক্কা না করে শাশ্বত বললেও হয়তো ভুল হবেনা)। তিনি সেই অল্প কয়েকজন শিল্পীদের একজন যারা কেবল ব্যাকরন মেনে গল্প বলেননা, যারা ভাষা সৃষ্টি করেন।নিজের ভাষা।যাদের প্রতিটি সৃষ্টি হয়ে ওঠে স্থায়ী,দীপ্র,গুরুত্বপূর্ণ। তারকোভস্কি সময়ের স্থপতি,দৃষ্টির কবি।দীর্ঘ,ধীর,নিরবিচ্ছিন্ন,দার্শনিক,নৈসর্গিক,কাব্যিক… এবং বিশেষণোত্তর।

আন্দ্রেই তারকোভস্কি

 

 

 

 

(ছবি সোর্সঃ গুগল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *