পথের পাঁচালী

অন্তর চক্রবর্তী


শৈশবে সমালোচনা বলতেই বুঝতাম দোষ- ত্রুটি সম্পর্কে আলোকপাত করা !  “সম আলোচনা “ এর ধারণা পরিষ্কারভাবে বুঝলাম যখন তখন থেকেই এই সমতার প্রতি আমার তীব্র সজাগ দৃষ্টি ।  কিন্তু সবকিছুর তো আর সমান আলোচনা চলে না। মা-বাবার সমালোচনা , দেশের সমালোচনা করা  দুষ্কর । ঠিক তেমনি কঠিন “পথের পাঁচালী “ –র সমালোচনা করা ।

বাংলার – বাঙালির  চলচ্চিত্রের-ই শুধু নয় – পুরো শিল্প- সংস্কৃতির ইতিহাসের পাঁচালী গাইতে গেলে যে কটি উপাদান কে  সমালোচনার ঊর্ধ্বে  রাখতে হয়- পথের পাঁচালী তাদের মধ্যে অন্যতম ।  সমালোচনার অতীত তিন ঐতিহাসিক  বাঙালি ধ্রুব নক্ষত্র-    সাহিত্যিক ( বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ) প্রণীত , পরিচালক ( সত্যজিৎ রায়) নির্মিত , সুরস্রষ্টা (রবি শঙ্কর )এর  সুরারোপিত এক মহাকাব্যিক সৃষ্টি পথের পাঁচালী । বাঙ্গালির অহংকার , অভিমান । যতদূর সম্ভব সেই অভিমান নিয়েই আমাদের  আজকের সমালোচনা।

পশ্চিম বঙ্গ সরকারের অনুদান এ নির্মিত পথের পাঁচালী সর্বপ্রথম প্রদর্শিত হয় ৩ ই মে , ১৯৫৫ সালে । জিতে নেয় ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার , এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবের “  শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল “  পুরষ্কার ।  এখনো পর্যন্ত প্রায় বিশ্বের সকল “শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র তালিকাতেই “এর অন্তর্ভুক্তি সুনিশ্চিত । কিন্তু প্রচণ্ড খ্যাতির এই শীর্ষে আরোহণ খুব একটা সহজ ছিল না ।

কলকাতার এক প্রত্যন্ত গ্রাম নিশ্চিন্দিপুর এর  পটভূমিকায় এক সাধারন কিশোর অপুর বেড়ে ওঠার অসাধারন  আখ্যান  পথের পাঁচালী । বিভূতিভূষণ এর এই অমর সৃষ্টি বই আকারে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। ১৯৪৪ সালে সত্যজিৎ রায়,  তৎকালীন সিগনেট প্রেস এর গ্রাফিক ডিজাইনার , বইটির একটি পুনঃমুদ্রনের  অলংকরণ করেন।  তখন-ই তিনি সর্বপ্রথম বইটি পড়েন । কথিত আছে সিগনেট প্রেসের তৎকালীন স্বত্বাধিকারী ডি কে গুপ্ত সত্যজিৎ রায় কে বলেন-বইটি একটি অসামান্য চলচ্চিত্রের রূপরেখা হতে পারে। সত্যজিৎ এর মনে ধারণাটি বসে যায় , এবং পরবর্তীতে ১৯৪৬-৪৭ সালে যখন তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবেন তখন তিনি এই কালজয়ী উপন্যাসটির-ই প্রথমাংশ বেছে নেন।

পথের পাঁচালীর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অপুকে ঘিরে। নিশ্চিন্দিপুর এর অভাবী গ্রাম্য পূজারী ব্রাহ্মণের ছেলে অপু । বাবা হরিহরের গ্রামে অগাধ সম্মান, কিন্তু তিনি ঠিক বৈষয়িক না । যাত্রা-পালা রচনা নিয়ে মেতে থাকেন । দৃঢ় ব্যাক্তিত্তসম্পন্না মা সর্বজয়ার তাই সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সংসারে আশ্রিতা হরিহরের বৃদ্ধা বোন ইন্দির ঠাকরুনের কপালে তাই দু-বেলাই জোটে সর্বজয়ার গঞ্জনা । বড়দের এই সমস্যাসংকুল দৈনন্দিন জীবনের কিছুটা ছোঁয়া লাগলেও গ্রামীণ প্রকৃতি, নির্ভার শৈশব আর ডানপিটে বড় বোন দুর্গার নিকট সান্নিধ্যে অপু বেড়ে ঊঠতে থাকে ধীরে ধীরে – প্রস্ফুটিত হতে থাকে অনাবিল স্নিগ্ধতায় । এই বেড়ে উঠা- অপুর একার নয়।এ যেন উক্ত সময়ের  প্রেক্ষিতে বাংলার গড়পরতা প্রতিটি গ্রামের হাজার শিশুর পথ চলার কাহিনী ।  কিন্তু শৈশব কার চিরকাল থাকে ! ঝড় আসে। সবকিছু লন্ডভন্ড হয় । ঝড়ের রাতের তান্ডবে দপ করে নিভে যায় কোন প্রিয়জনের প্রাণের প্রদীপ। কিন্তু  অপু আবার ঘুরে দাঁড়ায় ।আবার পথ চলে- শাশ্বত আবহমান পথ।

বিভূতিভূষণ আর সত্যজিৎ এর  পাঁচালী এক ছিল না ।  বিভিন্ন জায়গায় চিত্রনাট্যে (মজার ব্যাপার হচ্ছে পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের কোন সুনির্দিষ্ট চিত্রনাট্য ই ছিল না) পরিবর্তন এনেছিলেন সত্যজিৎ । ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যু দৃশ্য , অপু ও দুর্গার মাত্র কয়েক সেকেন্ড এর জন্য রেলগাড়ি দেখতে না পারা- এ সব কিছুই সত্যজিতের সংস্করন । যারা দেখেছেন, তারাই জানেন- কি অভূতপূর্ব   স্পর্শকাতর ব্যাঞ্জনায়  দৃশ্যায়িত  হয়েছে এই  সংযোজন গুলি ।

আগেই বলা হয়েছে,  পথের পাঁচালীর নির্মাণ সহজ ছিল না । কলাকুশলী নির্বাচন ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ । কোন প্রতিষ্ঠিত চেহারা নিয়ে কাজ করতে চাননি সত্যজিৎ । অভিনেতাদের মধ্যে একমাত্র হরিহর চরিত্রে রূপদানকারী কানু বন্দ্যোপাধ্যায় ই যা একটু পরিচিত ছিলেন । সর্বজয়া চরিত্রে অভিনয়্ করে দেশ-বিদেশে বিপুল পরিমাণে প্রশংসা অর্জনকারী করূণা বন্দ্যোপাধ্যায় আদতে ছিলেন এক শখের অভিনেত্রী-সত্যজিতের বন্ধুপত্নী ও সত্যজিতের স্ত্রীর বান্ধবী । “দুর্গা” ঊমা দাসগুপ্ত এর আগে থিয়েটার এ কিছু কাজ করেছিলেন । অপু চরিত্রের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন সত্যজিৎ -কিন্তু মন মত কাউকেই খুঁজে পাননি তিনি। অবশেষে সত্যজিতের স্ত্রী তাদের প্রতিবেশী একটি ছোট ছেলেকে পছন্দ করেন। সেই একদম অভিনয় না জানা আনকোরা সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় ই হয়ে উঠেন অপু। (পরবর্তীতে সুবীরের জীবন কাহিনী নিয়ে ২০১৩ সালে নির্মিত হয়েছে আরেকটি সিনেমা- অপুর পাঁচালী) সবচাইতে চাঞ্চল্যকর  ছিল ইন্দির  ঠাকরুন চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে “চূনীবালা দেবী” কে চুক্তিবদ্ধ করা । এক কালে  রবীন্দ্রনাথের নির্দেশনায় অভিনয় করা অশীতিপর এই বৃদ্ধা অভিনেত্রীকে সত্যজিৎ রায় খুঁজে বের করেন কলকাতার এক “রেড-লাইট এরিয়া” থেকে ।

 

অর্থের যোগান নিশ্চিন্ত করতে ধার-দেনা, নিজের স্ত্রীর গহনা বন্ধক, নিজের গ্রামোফোন রেকর্ড বিক্রি- কি করেননি সত্যজিৎ ! অবশেষে তৎকালীন কলকাতার মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়  পথের পাঁচালীর জন্য সরকারি অনুদান মঞ্জুর করেন । সব মিলিয়ে পথের পাঁচালীর শুটিং শেষ হতে হতে তিন বছর লেগে যায়। সৌভাগ্য ক্রমে এই তিন বছরের মধ্যে অপুর গলা ভাঙ্গেনি, দুর্গা লক্ষণীয়  ভাবে বেড়ে উঠেনি , এবং ইন্দির ঠাকরুন মারা যাননি। পরবর্তীতে সত্যজিৎ এই তিনটি ঘটনাকে তিনটি চমৎকার হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

পথের পাঁচালী মুক্তির আগেই  প্রখ্যাত আমেরিকান পরিচালক জন হিউস্টন এর নজরে আসে।  তিনি তখন-ই এই  চলচ্চিত্রের  এবং সত্যজিতের   ভূয়সী প্রশংসা করেন । মুক্তির পর অবধারিত ভাবেই  পথের পাঁচালী বিশ্ব জুড়ে সমালোচক দের আনুকূল্য লাভ করে । সমালোচকরা এটিকে নিও- রিয়েলিজম ধারার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন।( উল্ল্রেখ্য নিও- রিয়েলিজম ধারার প্রবর্তক ভিত্তরিও ডি সিকা’র “বাইসাইকেল থিফ’ দেখেই  সত্যজিৎ সিনেমা পরিচালনায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন।)  পথের পাঁচালী  বিশ্বজুড়ে কান’ সহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করে। “চূনীবালা দেবী”  ইন্দির ঠাকরুন চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে ম্যানিলা চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার জিতেন। ভারতীয় অভিনেতাদের মধ্যে তিনি-ই সর্বপ্রথম কোন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।

সবাই যে পথের পাঁচালীকে নিয়ে খুশি ছিলেন তা কিন্তু নয় । ট্রুফো নাকি মন্তব্য করেছিলেন-“আমি এমন কোন সিনেমা দেখতে চাই না যেখানে গরিব কৃষক রা খালি হাত দিয়ে খাবার খায় ।“ ভারতীয় পার্লামেন্ট এর সদস্য ও বিখ্যাত অভিনেত্রী নার্গিসও  সত্যজিতের কঠোর ভাষায় নিন্দা করেন। তার অভিযোগ ছিল সত্যজিৎ ভারতের দারিদ্র্য ভেঙে খ্যাতি লুটছেন । কিন্তু টুকটাক এই নিন্দাকে বহুগুণে ছাপিয়ে গেছিল প্রশংসার ফোয়ারা । বিশ্বখ্যাত চিত্র সমালোচক রজার ইবারট এর মতে –“পথের পাঁচালী  সিনেমা সম্পর্কে  আমাদের গতানুগতিক অবিশ্বাস কে  প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং একটি প্রকৃত চলচ্চিত্র কেমন হতে পারে তা নিশ্চিত করে।” পলিন কেল বলেন- “পথের পাঁচালী একটি অপূর্ব , কৌতুকময় এবং প্রেম রসে সিক্ত  সৃষ্টি যা পর্দায় বাংলার এক নতুন রূপ তুলে ধরে।“

এত সব বিখ্যাত সমালোচক দের মন্তব্যের সাথে নিজের ব্যাক্তিগত মন্তব্য যোগ করা অবান্তর কিন্তু সংবরণ- দুঃসাধ্য । পথের পাঁচালীকে আমি দেখি এক অত্যন্ত আবেগ ঘন কাহিনীর একান্ত বস্তুনিষ্ঠ বয়ান হিসেবে । “চূনীবালা দেবী”  এর অভিনয় আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে। (কি হল? অথবা আমি দীন ভিখিরি)। আবেগাপ্লুত হয়ে যাই । প্রথম বৃষ্টিতে দুর্গার সেই ভেজা-  যেন ভবিতব্য কে আলিঙ্গন । ঝড়ের রাতের সেই বেড়া ভাঙ্গার শব্দ- অমোঘ ,চূড়ান্ত নিয়তি্র করাঘাত যেন । তুলসী চক্রবর্তী-র গ্রাম্য মুদি দোকানদার  ও  পাঠশালার পণ্ডিতের যুগপৎ চরিত্রে অসামান্য সাবলীল অভিনয়। কত কিছু বলা যায়। এক একটি দৃশ্য  এক এক দিক দিয়ে অনন্য । সত্যজিৎ ছাড়া প্রথম ছবিতেই অনুভূতি, আঙ্গিক ও বস্তুনিষ্ঠতার এই সমাহার ঘটানো আর  কারুর পক্ষে সম্ভব ছিল বলে মনে হয়না।

 

একটি একক চলচ্চিত্র হিসেবেই নয়- একটি  লক্ষণীয়  ধারা তৈরীতেও   পথের পাঁচালীর অবদান অপরিসীম । বাংলা প্যারালাল বা আর্ট হাউজ  সিনেমার  সার্থক সূচনা বলতে গেলে পথের পাঁচালী দিয়েই। পথের পাঁচালীর সাফল্য সত্যজিৎ কে উদ্বুদ্ধ করে  অপুর বাকি কাহিনী নিয়ে আরও দুটি যুগান্তকারী সিনেমা- “অপরাজিত” ও “ অপুর  সংসার” নির্মাণে । অপু ট্রিলজি নামে খ্যাত এই চলচ্চিত্র তিনটি  বিশ্বের সকল সিনেমা প্রেমী ও বোদ্ধাদের নিকট আজ অবশ্য দর্শনীয় অতি পরিচিত নাম ।  তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ই শুধু নয়- বিশ্ব  চলচ্চিত্রের  ইতিহাসে ও পথের পাঁচালী    যুক্ত করেছে বিশেষ ব্যাঞ্জনা – বিশেষায়িত  হয়েছে একটি  মাইলফলক হিসেবে ।

 

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *