সম্পর্ক

সনৎ মাইতি 


 

যুদ্ধের পটভূমি

 

মানুষ তো উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক কিছু পায়, ক্লাস ফোর ছাড়িয়ে যখন ফাইভে উঠলাম তখন আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেলাম স্যারেদের ক্ষেপানোর নাম- বিচিত্র সব নাম, এর মধ্যে সব চেয়ে দুরন্ত ক্ষেপানোর নাম ছিল কেঠো- ভদ্রলোক কে স্কুলের ছেলেপুলেরা আড়ালে কেঠো বলে ডাকত , আর যে সব ছেলেপুলেরা স্কুল থেকে পাশ করে বেড়িয়ে গেছে তারা আর তাকে আড়ালে কেঠো ডাকত না তারা ভদ্রলোকের সামনেই  তাকে কেঠো ডাকত। আর প্রাণপণে ছুটত। স্কুলের ছেলেরা স্বপ্ন দেখত তারাও স্কুল পাশ করে স্যারের সামনে স্যারকে কেঠো বলে ছুটে পালাচ্ছে- বস্তুতপক্ষে স্যারের সামনে স্যারকে কেঠো ডেকে দাঁড়িয়ে ক্ষমতা সবার ছিল না কারণ ইতিহাস বলছে কোন এক সাহসী এইরকম করে ছিল এবং তাকে শেষপর্যন্ত ছোট্ট করে হাসপাতাল যেতে হয়ে ছিল কারণ কেঠো তার গলা টিপে ধরে ছিলেন এবং আশেপাশের লোকজনকে তা ছাড়াতে বিস্তর বেগ পেতে হয়ে ছিল।

 

কেঠো আসলে কী রকম ছিল তা জানতে আমরা একটা কথোপকথনের সাহায্য নিচ্ছি :

-বোকাচোদা বহুত ক্যালায়, আজকে আমাকে ডাস্টার ছুঁড়ে মারল।

– বাড়া আমরাতো প্ল্যান করেছি  বাইরে মালটাকে একদিন সবাই মিলে হেবি ক্যলাবো।

-ওই ভুল করিস না, বাল তোদের যা ফিগার তোরা সবাই মিলে অ্যটাক করলেও ওর কিছুই করতে পারবি না উলটে ক্যলানি খেয়ে উলটে পড়ে থাকবি। কেঠোর গায়ের বাড়া জোর জানিস ?  প্রথম জীবনে রাজমিস্ত্রি ছিল।

-তাহলে কি মালটাকে ক্যালানো হবে না? (গভীর চিন্তায়)

-হবে হবে কিন্তু তার জন্য ব্যয়াম করতে হবে , ভালোমন্দ খেতে হবে, গায়ে জোর বাড়াতে হবে। কেঠোর সমান হতে হবে। আমরা স্কুল থেকে বেরনোর পরেও পা্রিনি , (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) এখন তোরাই তো আশাভরসা।

 

এগল্প সবার ক্ষেত্রে প্রায় একই ছিল, সবাই ভাবত স্কুল থেকে বেড়িয়ে কেঠো কে খুব  শায়েস্তা করবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই পারেনি। সবাই কেঠো কে ভয় করত, স্কুলের কিছু সাহসী তাকে দূর থেকে কেঠো বলে ছুটত, কিন্তু পার পেত না শেষ কারণ কেঠোর প্রতিভা ছিল।  কেঠোর গলার স্বর ও মুখ মনে রাখার ক্ষমতা ছিল অসীম  – এবং তা থেকে  আসামি চিহ্নিতকরণ কে সে প্রায় আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে ছিল। কেঠোর আরেকটি গুণ ছিল বাইরে কেউ তাকে কেঠো বললে স্কুলে তাকে প্রথম চিহ্নিত করত তারপর ক্লাসে তাকে পড়া ধরত ।

ধরা যাক কেউ কেঠোর ধরা পড়া পেরে গেল, তাহলে কি কেঠো তাকে তবুও মারত? না কেঠো সেটি করত না, আবার পরের দিন পড়া ধরত। ততদিন পর্যন্ত পড়া ধরত যতদিন না পর্যন্ত তাকে মারতে পারত। কেঠো অপেক্ষা করতে জানত, কেঠোর ক্লাসের বাইরের ছাত্ররাও যখন তাকে খেপাত ,কেঠো কিচ্ছুটি না বলে অপেক্ষা করত পরবর্তী বছরগুলোর  জন্য। কখন তার পিরিযড় পড়বে ছেলেটির ক্লাসে। আর কোনদিন যদি সৌভাগ্য বশত তা হত তাহলে   –   হাউ মাউ কাউ মানুষে গন্ধ …..

কেঠো পড়া ধরত, দুর্ভাগ্য বশত পড়া না পারলে   –  বল হরি হরি বল …

কেঠোর সে দিন জ্ঞান থাকত না।

কেঠোর সাথে ছেলেদের অলিখিত যুদ্ধ ছিল।

নায়কের আগমন

ভিলেনের কথা তো হল, আমার গল্পে কিন্তু নায়কও আছে। নায়ক প্রবাদ প্রতীম , নায়ক প্রায় মিথ । নায়ক কে আমি দেখিনি, তার কথা শোনা শুনেছি। এবং অল্প অল্প প্রেমে পড়েছি।

শোনা যায় নায়ক হৃষ্টপুষ্ট বলশালী কেউ ছিলেন না, আসলে নায়ক কাউকে ভয় পেত না আর সেটাই নাকি নায়কের মস্ত বল ছিল। নায়ক ডোন্ট কেয়ার গোছের কেউ ছিলেন। শোনা যায় কেঠো নাকি নায়ক কে ভয় করত। আর এই নায়কের হাতেই কেঠো বেশ কয়েকবার হেনস্তা হয়ে ছিল । কেঠো দূর থেকেও নায়ককে দেখলে রাস্তা চেঞ্জ করত। নায়কের দুটো সুবিধা ছিল এক নায়ক কলেজে পড়ত, দুই নায়কের বাইক ছিল। আর ভিলেনের একটা অসুবিধা ছিল -ভিলেন সাইকেল চালাত। আর তাই সম্ভবত দেশবাসী নায়ক ও ভিলেনের সন্মুখ সমর থেকে বঞ্চিত হয়ে ছিলেন কিছু দিন পর্যন্ত।

কিন্তু ঈশ্বরের  একান্ত ইচ্ছায় সে আক্ষেপও একদিন দূর হল। দুজনেই প্রায় মুখোমুখি পড়ল একদিন গোধূলি লগ্নে। সুসজ্জিত আলোর রোশনাই এর মাঝে।

কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর ও যুদ্ধ

 রক্ষাকালির পুজো প্রান্তরে মেলা। হরেক মাল ছ টাকা। বাদাম ভাজা। ঘুগনিওয়ালা। নাগরদোলা।

নায়ক ও তার দুই বন্ধু এক ঘুগনিওয়ালার কাছে ঘুগনি খাচ্ছিল, মেয়ে দেখছিল আর গুলতানি করছিল।

ভিলেন তথা কেঠো মেলায় বেড়িয়ে ছিল তার সদ্য যুবতি মেয়ে কে নিয়ে। মেয়ে ঘুগনিওয়ালা কে দেখে  বলতে লাগল – বাবা বাবা ঘুগনি খাব…

কেঠো মেয়ে কে নিয়ে ওদিকেই নিয়ে যাচ্ছিল , হঠাৎ দেখল নায়ক তার দিকে তাকিয়ে একবার হাসছে আর তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে একবার হাসছে। কেঠোর বিচি শুকিয়ে গেল। মেয়েকে বলতে লাগল চল অন্য কিছু খাই। কিন্তু অবোধ মেয়ে কি আর তার বাবার গল্প জানে ? সে তার বাবা কে পাত্তা দিল না ।

  • না আমি এখনি ঘুগনি খাব।
  • দূর এখানের ঘুগনি বাসি হয়, অম্বল হবে শুধু শুধু……
  • কিচ্ছু হবে না , বাসি ঘুগনিই খেতে ভাল।

এই করতে করতে মেয়ে এগিয়ে চলল , পিছন  পিছন তার অসহায় বাবা। নায়ক মেয়েকে দেখছিল আর তার বাবা কে দেখছিল।  আর মুচকি হাসছিল।

নায়ক প্রথমে কিছুই বলল না, শুধু মজা দেখল। আর ভিলেন ঘামতে লাগল । যেন এখনই মেলা ছেড়ে পালাতে পারলে বাঁচে। এদিকে মেয়ের কোন  ভ্রূক্ষেপ নেই সে রসিয়ে ঘুগনি আস্বাদন করছে। হঠাৎ নায়ক ভিলেনের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল

  • কি রে কেঠো নতুন মাল তুললি নাকি?

এর পরের ঘটনা যা শুনে ছিলাম তা আসলেই মিথ। সত্যতা কিছুই নেই বলেই আমার বিশ্বাস। শোনা যায়  এরপর নায়ককে ধরতে ভিলেন নাকি সারা রাত দৌড়ে ছিল।

 

 

 

আর্ট – ফারজানা মণি 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *