টুকরো স্বপ্ন

আশিকুর রহমান


 

ছোট্ট একটা বিন্দুর মত টিপ থাকবে…………না। থাকবে না।

খালি কপালটুকু দেখে আমি ভাবব টিপটা দিলে চিরাচরিত বাঙালি মেয়ের লাবণ্য ফুটে উঠবে।

  • অ্যাই টিপ দিলে না? শাড়িতে টিপ ছাড়া কেমন লাগে না?

ও আমার কথা শুনে আস্তে করে কোমল হাতে লাল রক্ত বিন্দুটা বসিয়ে দেবে ঠিক কপালের মাঝখানে। ও জানে আমি টিপ পছন্দ করি না। তবুও আমার কথা শুনে দেবে।

আয়নায় নিজেকে শাড়িতে দেখে মুগ্ধ হবে মনে মনে। কিন্তু মুখে বলবে- ‘ধেত্তেরি! আমাকে দেখতে বয়স্ক লাগছে। পড়ব না শাড়ি। তোমার পাশে আমাকে খালাম্মা-খালাম্মা লাগবে!’

আমি সেসবে কান দেব না। আমি চুপচাপ দেখবো ওকে টিপে মানিয়েছে কিনা। আমি প্রথমে ভ্রু কুঁচকে দেখবো। তারপর ভারি চশমাটাকে তর্জনী দিয়ে একটু ঠেলে, ভালোমত চোখে বসিয়ে।

নাহ! যে রকম ভেবেছিলাম, মিলছে না। টিপ ছাড়াই সুন্দর লাগছিলো ওকে।

  • চশমার সাথে টিপটা মানাচ্ছে না। খুলে ফেলো!

চশমাটাই খুলে ফেলতে চাইবে ও। জানি আমি। কিন্তু আমি খুলতে দেবো না। আমার ভালো লাগে। ভালো লাগে চশমা পড়া মেয়েদের।

ভালো লাগে চশমা পড়া এই মেয়েটাকে। ভালো লাগা থেকে ভালোবেসে ফেলবো কবে যেন। টেরই পাব না। তারপর হুট করে একদিন প্রমান করে দেব- ও আমার জন্যই। আমি বোকা-সোকা, মোটা গ্লাসের ময়লা চশমা চোখে ঝুলানো প্রতিভাশূন্য চারুকলার ছাত্র হয়েছি ওর ছবি ক্যানভাসে না, মনের দেয়ালে রক্তাভ রঙে আঁকার জন্যই; ও এসে আমাকে টেনে তুলবে এই আশায় ডুবে থাকব জীবন যতসব অজানাতে, আশংকাতে গুটিসুটি হয়ে জীবনের কোন এক কোণে।

আমিও তো ওর জন্যই। ও সব সময় সব কিছুতে জিততে চাইবে। তারপর ভুল করেই যেন একদিন আমাকেও জিতে নেবে। আমি হেরে গিয়ে শিরস্ত্রান খুলে একদিন আত্নসমর্পন করবো বিনাযুদ্ধেই, ওর বাহুডোরে।

ওর সাজ তখনো শেষ হবে না। আমি উঠে দাঁড়াবো এবার। ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে চুল শুঁকবো। মমমম……ওটা কি শ্যাম্পুর ঘ্রাণ? নাকি ওর নিজের চুলের ঘ্রাণ? কেমন যেন নেশা নেশা লাগছে।   নেশা! সেতো কবেই লেগেছে।

  • আরে কি করছ? দিলে তো বারোটা বাজিয়ে! এত কষ্ট করে চুলটা ঠিক করলাম! এমনিতেই মাথায় চুল কম! ধুর! সরো পেছন থেকে!

আমি বিব্রত হয়ে স্বরে আসার ভান করবো। কেবলই ভান। আমিতো ধমক খেয়েও মহা খুশি। ওর এমন ভালোবাসা মাখানো ধমক তো কেবল আমার জন্যই।

  • আরে তোমার লিপস্টিক দিতে কতক্ষন লাগছে? দেরি হয়ে যাচ্ছে তো!

আমি বিরক্ত হওয়ার ভান করব। ও লিপস্টিক দিলে মরুর বেদুইনের মত তৃষার্ত দৃষ্টি নিয়ে আমিই তো তাকিয়ে থাকি। হুট করে ঝরে পড়া এক ফোঁটা বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাবার আশায়।

ও লিপস্টিক দেয়া শেষ হলে আমার দিকে তাকিয়ে কি একটা হাসি দেবে না? দেবে তো!

ঐ যে এখনই দিচ্ছে! ঠোঁটের ফাঁকে ডানপাশে একটা গজদাঁত উঁকি দিচ্ছে। আমার মনের দুরভিসন্ধি বুঝে ফেলেছে নিশ্চয়ই। ও তো বুঝবেই।

নইলে ও অমন হাসি দেবেই বা কেনো? ওটা যদি দুই ঠোঁটের বহুদিনের আকাঙ্খিত সন্ধিচুক্তির ইশারাই না হয়, কেনো তাহলে ঐ হাসিতে আহ্বান দেখতে পাব? কিন্তু ও আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসিটা দিচ্ছে। পাজী মেয়ে!! আমাকে অধৈর্য্য করে তোলার এটা একটা ছুতো কেবল ওর।

ভয়ে ভয়ে কল্পনা করবো যে আমি এগিয়ে এসে টুক করে চুমু দেব। বাস্তবে সাহস করে উঠতে পারবো না। ও আবার এসব আদিখ্যেতা মেশানো ন্যাকা ভালোবাসা একদম পছন্দ করে না। একদমই না। ও খুবই সিরিয়াস ঘরানার মেয়ে।

হ্যাঁ ওই তো! শব্দ করে লিপস্টিকটা রেখে দেবে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে।

আয়নার সামনে থেকে আস্তে করে উঠে ও আমার দিকে ফিরে চাইবে। আঁচলটা কাঁধে বসিয়ে নিয়ে ঠিকভাবে। হাত নড়ে ওঠার সঙ্কেত দেবে কাঁচের চুড়ি গুলোর রিনিঝিনি শব্দ। এবার নিজের রক্তাভ পুরু ঠোঁটটা একটু ফাঁক করে অবশেষে আমাকে অনুমতি দেবে ওর অধরযুগল স্পর্শ করার। বাঙালী নারীর সাজে সেজে লাল রঙটা এবার ও অপচয় করবে আমার শুকনো ঠোঁটে ঘষে ঘষে।

করবে তো নিশ্চয়ই।

একদিন না একদিন।

 

 

 

আর্ট – ফারজানা মণি 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *